জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ভূমধ্যসাগরে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় ‘হ্যারি’-এর প্রভাবে সৃষ্ট ভয়াবহ বৈরী আবহাওয়ায় প্রায় এক হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী নিখোঁজ হয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ইতালিভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা মেডিটেরানিয়া সেভিং হিউম্যানস। সংস্থাটির দাবি, এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ভূমধ্যসাগরের অভিবাসন রুটে সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হতে পারে।
লিবিয়া ও তিউনিসিয়া থেকে যাত্রা করা অভিবাসীদের দেওয়া সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এনজিওটি জানায়, ঘূর্ণিঝড়ের সময় একের পর এক নৌকা সমুদ্রে হারিয়ে গেছে। বহু যাত্রী আর ফিরে আসেনি, আর তাদের স্বজনরাও কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না। মেডিটেরানিয়া সেভিং হিউম্যানস-এর প্রেসিডেন্ট লরা মারমোরালে সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন,
“এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির দিকে এগোচ্ছে অথচ ইতালি ও মাল্টা সরকার কার্যত নীরব তাদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত উদ্ধার তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।”
রোমের মেরিটাইম রেসকিউ কোঅর্ডিনেশন সেন্টার (এমআসিসি)-এর স্যাটেলাইট তথ্যের বরাতে জানা গেছে, ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৩৮০ জন অভিবাসী সাগরে নিখোঁজ ছিলেন। এই অভিবাসনপ্রত্যাশীরা, ১৪ থেকে ২১ জানুয়ারির মধ্যেতিউনিসিয়ার স্ফ্যাক্স শহর থেকেআটটি নৌকায় করে ভূমধ্যসাগরে যাত্রা শুরু করেছিলেন। নৌকাগুলোতে নারী ও শিশুও ছিলেন। এনজিওর দাবি, ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত এসব নৌকার কোনোটিরই সন্ধান পাওয়া যায়নি, এমনকি নিশ্চিতভাবে কাউকে উদ্ধারের খবরও নেই।
সংস্থাটি জানায়, ঘূর্ণিঝড় হ্যারির প্রভাবে ওই সময়, বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ১০০ কিলোমিটার, ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল ৭ মিটার (২২ ফুট)–এর বেশি। গত দুই দশকে ওই অঞ্চলে এমন বিপজ্জনক সামুদ্রিক পরিস্থিতি দেখা যায়নি বলে দাবি করেছে মেডিটেরানিয়া সেভিং হিউম্যানস। এই চরম পরিস্থিতির পরও ইউরোপীয় সমুদ্র কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
তিউনিসিয়ায় অবস্থানরত অভিবাসীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫ জানুয়ারির পর থেকে স্ফ্যাক্স শহরের আশপাশে নিরাপত্তা বাহিনীর চাপ কিছুটা কমে যায় এবং উপকূলীয় নজরদারিতে শিথিলতা দেখা দেয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মানবপাচারকারীরা একাধিক নৌকা সাগরে পাঠায়। অভিযোগ রয়েছে, একজন পাচারকারীই পাঁচটি নৌকা পাঠিয়েছিল। প্রতিটি নৌকায় ছিল ৫০ থেকে ৫৫ জন যাত্রী। এছাড়া উপকূলের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে আরও কয়েক ডজন নৌকা যাত্রা শুরু করে
২২ জানুয়ারি ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপে মাত্র একটি নৌকা পৌঁছায়। সেখানে, একজন অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় ও এক বছর বয়সী যমজ শিশু সাগরে নিখোঁজ হয়। এনজিওর ধারণা, ওই সময় সাগরে যাত্রা করা অন্যান্য নৌকাগুলো হারিয়ে গেছে।
এদিকে সংস্থাটি আরও জানায়, মাল্টা কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সাগর থেকে একাধিক মরদেহ উদ্ধার করেছে, যা নিখোঁজের আশঙ্কাকে আরও জোরালো করছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ভূমধ্যসাগরে অভিবাসন সংকট এখন আর শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি একটি গভীর মানবিক জরুরি অবস্থা। তাদের অভিযোগ, আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অভিযান পরিচালিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগিতে ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ ও বৈধ আশ্রয়ের পথ না থাকায় অভিবাসীরা বাধ্য হচ্ছে চরম আবহাওয়া ও প্রাণঘাতী ঝুঁকির মধ্যেও সাগর পাড়ি দিতে।
