রবিবার, ১৬ই আগস্ট, ২০২৬   |   ১লা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেলজিয়ামের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দাবানলে দেশটির একটি বিখ্যাত প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বিশাল এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে শনিবার পূর্ব বেলজিয়ামের শত শত গ্রামবাসীকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জার্মানি সীমান্তবর্তী ‘হাই ফেন্স’ ন্যাশনাল পার্কে গত শুক্রবার এই আগুনের সূত্রপাত হয় এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশজুড়ে অতিরিক্ত দমকল কর্মী মোতায়েনের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্যান্য দেশ থেকে হেলিকপ্টার ও ওয়াটার বম্বার (পানি ছিটানোর বিমান) আনা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, এটি বেলজিয়ামের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাবানল। ১৯১১ সালের তীব্র তাপদাহ ও খরা পরিস্থিতির সময় এই অঞ্চলের পাইন বন ও পিটল্যান্ডস এলাকায় একই রকম একটি বিধ্বংসী দাবানল হয়েছিল। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শুক্রবার মাত্র ৮০ হেক্টরে শুরু হওয়া আগুন রবিবার সকালের মধ্যে ৩,০০০ হেক্টরেরও বেশি (৭,৫০০ একর) এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।

কাছাকাছি ওয়ায়েমস এলাকার এক রেস্তোরাঁ মালিক ডেভিড রডলফস বার্তা সংস্থা এএফপি-কে টেলিফোনে বলেন, ‘চারপাশে শুধু ধোঁয়া, কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। শুক্রবার দুপুরের দিকে যখন খাবার টেবিলের ওপর ছাই পড়তে শুরু করে, আমরা গ্রাহকদের দ্রুত চলে যেতে বলি। ডেজার্ট খাওয়ারও সময় ছিল না, সবাইকে চলে যেতে হয়েছিল।’

কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে যে, ওই অঞ্চলের পাহাড়ি ও অসমতল ভূমির কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের পক্ষে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে কাছে গিয়ে আগুন নেভানো সম্ভব হচ্ছে না। সুরব্রডট এবং বুয়েটগেনবাখ নামের নিকটবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শনিবার বিকেলে বাড়িঘর ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বেলজিয়ামের রাষ্ট্রীয় 

সংবাদ সংস্থা বেলগা জানিয়েছে, প্রায় ৬০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী মালমেডি শহরের একটি জিমনেসিয়ামকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

বেলজিয়ান রেড ক্রসের রোমান বুহাবিন এএফপি-কে বলেন, ‘আমরা এখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের প্রয়োজনীয় তথ্য, খাবার ও পানি সরবরাহ করছি এবং বিশেষ করে দুর্বল ও বয়োবৃদ্ধদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করছি।’ এছাড়া এলাকার অন্যান্য বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার এবং দরজা-জানালা বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ওয়ালোনিয়া অঞ্চলের সরকারি মুখপাত্র নিকোলাস ইয়েরনক্স সতর্ক করে বলেছেন, আগুন এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তিনি বলেন, ‘আগুন ঘরবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, তবে আমরা বাড়িঘর রক্ষায় আমাদের সব সম্পদ ব্যবহার করছি।’

পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেলজিয়াম দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিভিল প্রটেকশন মেকানিজম সক্রিয় করেছে, যার মাধ্যমে তারা মহাদেশের অন্যান্য দেশের সহায়তা পাচ্ছে। নেদারল্যান্ডসের একটি হেলিকপ্টার ইতিমধ্যেই কাজ শুরু 

করেছে এবং সুইডেনের দুটি পানি ছিটানোর বিমান আজই এসে পৌঁছাবে।

ইউরোপীয় কমিশনার হাদজা লাহাবিব এই দুর্যোগকে জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে এএফপি-কে বলেন, ‘দাবানল মৌসুম আগে কখনোই বছরের এত শুরুতে এবং এত উত্তর গোলার্ধে শুরু হয়নি।’

দাবানল কবলিত অঞ্চলের পিট বগ ও জলাভূমি এলাকার কারণে কাজ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বনের শেষ সীমানায় অবস্থান নিয়ে হিথল্যান্ড বা ঝোপঝাড়ের অংশটিকে পুড়তে দিচ্ছেন, কারণ ওই এলাকায় প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্থানীয় অনেক কৃষককে তাদের পানির ট্র্যাঙ্কসহ দমকল বাহিনীকে সাহায্য করতে এগিয়ে যাওয়ার ছবি পোস্ট করতে দেখা গেছে। বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন ধ্বংসযজ্ঞের গতি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ধ্বংসের গতি দেখে স্তব্ধ, তবে একই সাথে উদ্ধারকারীদের কাজের জন্য কৃতজ্ঞ। কৃষকেরাও তাদের ট্রাক্টর দিয়ে পুরো এলাকা ভেজা রাখতে সাহায্য করছেন।’

ইউরোপের অন্যান্য অংশের মতো বেলজিয়ামেও গত কয়েকদিন ধরে তীব্র তাপদাহ চলছে। শুক্রবার দেশের কিছু অংশে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।

বেলজিয়ামের এই দাবানল অঞ্চল থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে পশ্চিম জার্মানিতেও আরেকটি বড় ধরনের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে ইতিমধ্যেই হুরটগেনওয়াল্ড শহরের ঘরবাড়ির কাছাকাছি আগুন চলে আসায় প্রায় ১,৮০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version