বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আগামী ১ জানুয়ারি থেকে ইউরো গ্রহণকারী ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২১তম দেশ হতে যাচ্ছে বুলগেরিয়া। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি শেষে ইউরোজোনে যোগ দিতে যাচ্ছে পূর্ব ইউরোপের এই দেশটি। তবে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন আশার আলো রয়েছে, তেমনি রয়েছে মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার শঙ্কা।

ইইউর দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি বুলগেরিয়ায় ইউরো গ্রহণকে ঘিরে চলতি বছর “বুলগেরীয় লেভ রক্ষা করো” শিরোনামে একাধিক প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এসব আন্দোলনে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জাতীয় মুদ্রা হারানোর আশঙ্কাকে সামনে আনা হয়েছে। জনমতের একটি বড় অংশের মধ্যেও ইউরো নিয়ে নেতিবাচক ধারণা স্পষ্ট।

তবে একের পর এক সরকার ইউরোজোনে যোগদানের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী…

ইউরো গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে, ইউরোপের মূলধারার সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার হবে এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে রাশিয়ার প্রভাব থেকে দেশটি সুরক্ষা পাবে।

ইউরোর বিস্তার ও বুলগেরিয়ার যাত্রাপথ

ইউরো প্রথম চালু হয় ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি, তখনকার ১২টি দেশে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ইউরোজোনে যোগ দেয় ক্রোয়েশিয়া। বুলগেরিয়া ২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হয় এবং ২০২০ সালে ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে একযোগে ইউরো গ্রহণের প্রাথমিক ধাপ, ‘ইআরএম-২’ বা তথাকথিত ‘ওয়েটিং রুমে’ প্রবেশ করে।  ১৯৯০-এর দশকে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির অভিজ্ঞতার পর বুলগেরিয়া তাদের জাতীয় মুদ্রা ‘লেভ’-কে প্রথমে জার্মান মার্ক এবং পরে ইউরোর সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত করে। এর ফলে দেশটির মুদ্রানীতি কার্যত ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি)-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

জনমত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

ইইউর জরিপ সংস্থা ইউরোবারোমিটারের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৪৯ শতাংশ বুলগেরীয় নাগরিক ইউরো গ্রহণের বিরোধিতা করছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন মুদ্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রবল। আলফা রিসার্চ জরিপ সংস্থার বিশ্লেষক বোরিয়ানা দিমিত্রোভা এএফপিকে বলেন…

ইউরো গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সামান্য কোনো সমস্যা দেখা দিলেই তা ইউরোপবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রচারণার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।

তার মতে, এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জনমনে সন্দেহ ও ক্ষোভ উসকে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। সাম্প্রতিক দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভে রক্ষণশীল নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় বুলগেরিয়া এখন পাঁচ বছরে অষ্টম জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতা ইউরো গ্রহণের সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

লাভের পরিমান

সোফিয়াভিত্তিক ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জর্জি অ্যাঞ্জেলভ বলেন…

ইউরো গ্রহণের মাধ্যমে বুলগেরিয়া প্রথমবারের মতো এই মুদ্রা জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিতে পারবে।

ইসিবি প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ সম্প্রতি সোফিয়ায় বলেন…

ইউরো গ্রহণের সুফল হবে উল্লেখযোগ্য, যার মধ্যে রয়েছে সহজ বাণিজ্য, কম সুদের ঋণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং মূল্য স্থিতিশীলতা।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় ৫০ কোটি ইউরো (৭ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা) সমপরিমাণ মুদ্রা রূপান্তর খরচ সাশ্রয় করতে পারবে। বিশেষ করে পর্যটন খাত বড় সুবিধা পেতে পারে। কৃষ্ণ সাগর তীরবর্তী বুলগেরিয়ায় পর্যটন খাত থেকে চলতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৮ শতাংশ এসেছে।

মূল্যস্ফীতি

ইসিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরো গ্রহণের ফলে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব হবে সীমিত এবং স্বল্পমেয়াদি, প্রায় ০.২ থেকে ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট। তবে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে খাদ্যপণ্যের দাম আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা ইউরোজোনের গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। এই পরিস্থিতিতে ইউরো পরিবর্তনের সুযোগে ‘অযৌক্তিক’ মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সংসদ শক্তিশালী নজরদারি সংস্থা গঠন করেছে। এসব সংস্থা আকস্মিক দাম বৃদ্ধির তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছে সরকার।

চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরো গ্রহণ বুলগেরিয়ার জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগ হলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার অপরিহার্য। জর্জি অ্যাঞ্জেলভের ভাষায়…

ইউরোজোনে যোগদানের পুরো সুফল পেতে হলে অন্তত এক থেকে দুই বছর একটি স্থিতিশীল সরকার থাকা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version