বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় টেলিভিশন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি-এর নতুন পর্বে যুক্ত হয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। এবার ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় অর্ধশত বিদেশি নাগরিক অংশ নিয়েছেন অনুষ্ঠানটির নানা পরিবেশনা, নাট্যাংশ ও সংগীত উপস্থাপনায়। দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানবিক বার্তাকে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরার এই উদ্যোগ দর্শক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আয়োজকরা বলছেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক শক্তি ও অতিথিপরায়ণতার বার্তা পৌঁছে দিতেই এই বিশেষ আয়োজন।
বহু দশক ধরে প্রচারিত হয়ে আসা ইত্যাদি কেবল বিনোদন নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা, ঐতিহ্যচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম। অনুষ্ঠানটি পরিকল্পনা ও উপস্থাপনা করেন বিশিষ্ট নির্মাতা ও উপস্থাপক হানিফ সংকেত। তার সৃজনশীল পরিকল্পনায় এবারের আয়োজন পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাত্রা। আয়োজক সূত্র জানায়, ইউরোপের কয়েকটি দেশ ছাড়াও এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের বিদেশিরা অংশ নিয়েছেন দলীয় নৃত্য, বাংলা ভাষায় সংলাপ পরিবেশন, লোকগীতি উপস্থাপন এবং বাংলাদেশি সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরার সেগমেন্টে।
বিশেষ এই পর্বে বিদেশি অংশগ্রহণকারীরা বাংলায় গান গেয়ে ও সংলাপ বলে দর্শকদের চমকে দিয়েছেন। কেউ পরিবেশন করেছেন লালনসংগীতের অংশ, কেউ বা অংশ নিয়েছেন কৌতুক নাট্যাংশে। দর্শকসারিতে উপস্থিত অনেকে বলেন, বিদেশিদের মুখে বাংলা ভাষা ও দেশীয় সংস্কৃতির উপস্থাপন একটি আবেগঘন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, অনেকে এটিকে ‘সংস্কৃতির সেতুবন্ধন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা ও রিহার্সাল চলে। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই বাংলাদেশে কর্মরত কূটনীতিক, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থী। কেউ কেউ দীর্ঘদিন বাংলাদেশে বসবাস করছেন এবং বাংলা ভাষা শেখার চেষ্টা করছেন। তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ভাষা সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে উপস্থাপনা সাবলীল হয় এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সঠিকভাবে ফুটে ওঠে।
সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ কেবল একটি বিনোদনমূলক আয়োজন নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক কূটনীতিরও অংশ। বিদেশিরা যখন স্থানীয় সংস্কৃতিতে অংশ নেন, তখন তা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বের বার্তা দেয়। বিশেষ করে ইউরোপের অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের লোকসংগীত, পল্লীগীতি ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে পরিবেশনায় অংশ নেওয়ায় অনুষ্ঠানটি আন্তর্জাতিকতা পেয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি দেশের ‘সফট পাওয়ার’ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানের একটি অংশে বিদেশিরা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান, গ্রামীণ জীবন ও সামাজিক উদ্যোগ নিয়ে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। কেউ বর্ণনা করেন কিভাবে গ্রামের মানুষের আতিথেয়তা তাকে মুগ্ধ করেছে, কেউ বলেন বাংলা ভাষার সৌন্দর্যের কথা। এসব উপস্থাপনা দর্শকদের কাছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দেয়, নিজেদের সংস্কৃতিকে অন্যের চোখে দেখার সুযোগ তৈরি করে।
এবারের আয়োজন প্রযুক্তিগত দিক থেকেও সমৃদ্ধ। বড় পরিসরে মঞ্চসজ্জা, আলোকসজ্জা ও বহুমাত্রিক ক্যামেরা ব্যবহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। আয়োজকরা জানান, অনুষ্ঠানের ধারণকৃত অংশ সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে প্রবাসী বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক দর্শকরাও উপভোগ করতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেলিভিশন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এমন আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সহায়ক। এটি দেখায় যে বাংলাদেশ কেবল নিজস্ব সংস্কৃতিতেই সমৃদ্ধ নয়, বরং বৈচিত্র্য ও বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতিতেও উন্মুক্ত। বিদেশিদের অংশগ্রহণ তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে, অনেকে মন্তব্য করেছেন, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি বিনিময়ের আয়োজন করা যেতে পারে।
অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, বিদেশি অংশগ্রহণ যেন মূল সাংস্কৃতিক উপাদানকে আড়াল না করে। তবে আয়োজকরা স্পষ্ট করেছেন, অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাংলাদেশি সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের বার্তা দেওয়া, বিদেশিরা এখানে সহযাত্রী, মূলধারার বিকল্প নয়। বরং তাদের অংশগ্রহণে দেশীয় ঐতিহ্যের বৈশ্বিক আবেদন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইত্যাদি দেশের সামাজিক বাস্তবতা, উন্নয়ন, ঐতিহ্য ও মানবিক গল্প তুলে ধরে আসছে। এবারের আন্তর্জাতিক সংযোজন সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায়। দর্শকদের মতে, এটি প্রমাণ করেছে, সংস্কৃতি ভাষা ও সীমানা অতিক্রম করতে পারে। বিদেশিদের অংশগ্রহণ শুধু বিনোদন বাড়ায়নি; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের বার্তাও জোরদার করেছে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় অর্ধশত বিদেশির অংশগ্রহণে ইত্যাদির এবারের আয়োজন এক ব্যতিক্রমী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি কেবল একটি টেলিভিশন পর্ব নয়; বরং আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি সংলাপের এক অনন্য উদাহরণ। বাংলাদেশের সংস্কৃতি যে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপিত হতে পারে, এবারের আয়োজন তারই প্রমাণ রেখে গেল।
