বৃহস্পতিবার, ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর মধ্যে পেশাজীবীদের যাতায়াত ও চাকরি পরিবর্তন সহজ করতে নতুন একটি আইনগত প্রস্তাব পেশ করেছে ইউরোপীয় কমিশন। এর মাধ্যমে পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া মাত্র পাঁচ সপ্তাহে নামিয়ে আনা এবং ডিপ্লোমা ও সামাজিক নিরাপত্তার নথিপত্র ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন একক বাজার (সিঙ্গেল মার্কেট) গঠনের প্রায় ৪০ বছর পর দেশগুলোর মধ্যে পুঁজি, পণ্য ও সেবার অবাধ চলাচল সম্ভব হলেও কর্মীদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এখনো বিভিন্ন প্রশাসনিক বাধা রয়েছে।

এই প্যাকেজের উদ্দেশ্য হলো কর্মীরা যাতে ডিজিটাল উপায়ে তাদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য বিমার অধিকার প্রমাণ ও দাবি করতে পারেন। পাশাপাশি ইইউভুক্ত যেসব দেশে সংশ্লিষ্ট পেশা নিয়ন্ত্রিত, সেখানে তাদের যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা।

কমিশন এই উদ্যোগটিকে একক বাজারকে একটি ‘দক্ষতা বাজারে’ রূপান্তরের উপায় হিসেবে দেখছে। এটি অভিবাসী কর্মীদের অপব্যবহার থেকে আরও ভালোভাবে রক্ষা করবে, সীমান্ত পেরিয়ে মেধা নিয়োগ ও সেবা প্রদানে বাধা সৃষ্টিকারী জটিলতা দূর করবে এবং জালিয়াতি দমনে জাতীয় প্রশাসনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা উন্নত করবে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উর্সুলা ভন ডার লিয়েন পেশাগত যোগ্যতার পারস্পরিক স্বীকৃতি সহজ করার পক্ষে মত দিয়ে বলেন, ‘একক বাজারকে অবশ্যই একটি প্রকৃত দক্ষতা বাজারে পরিণত করতে হবে, যেখানে কর্মী ও ব্যবসার জন্য আরও বেশি সুযোগ থাকবে।’

ব্রাসেলস এক ধরনের ডিজিটাল সোশ্যাল পাস বা ডিজিটাল ওয়ালেট তৈরির প্রস্তাব করেছে, যার মাধ্যমে নাগরিকেরা সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে ভ্রমণের সময় তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার যাচাই করতে পারবেন। এই ওয়ালেটে এ১ সার্টিফিকেটের মতো নথিপত্র অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা নিশ্চিত করে যে একজন কর্মী নিজ দেশের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতাতেই রয়েছেন। এছাড়া ইউরোপিয়ান হেলথ ইন্স্যুরেন্স কার্ড ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইস্যু করার ব্যবস্থা রাখা হবে।

কমিশনের প্রত্যাশা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ নাগরিকদের জন্য এই ডিজিটাল ওয়ালেট উপলব্ধ হবে। এতে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে ডক্টরেট ডিগ্রি পর্যন্ত সব ডিপ্লোমা, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নথিপত্র এবং সামাজিক নিরাপত্তার অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষিত থাকবে। নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পূর্ববর্তী দশ বছরে অর্জিত যোগ্যতাগুলো এই ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আসবে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দ্রুত যোগ্যতা স্বীকৃতি এবং রিয়েল-টাইম নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে এই প্যাকেজটি ২০৪০ সালের মধ্যে প্রায় ৬ বিলিয়ন ইউরো আর্থিক সুফল বয়ে আনতে পারে।

এই প্রস্তাবের মাধ্যমে গতিশীলতার পথে থাকা বাধাগুলোও কমানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, কর্মক্ষম বয়সের মাত্র ১ কোটি মানুষ (যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৩.৯ শতাংশ) অন্য কোনো সদস্য রাষ্ট্রে বসবাস করতেন, যদিও জরিপে অংশ নেওয়া ১৮ শতাংশ মানুষ অন্য দেশে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে অর্জিত যোগ্যতার স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রক্রিয়াটিতে গড়ে ১৪ মাস সময় লাগে, যা কমিয়ে চার মাসে নামিয়ে আনা সম্ভব। এর ফলে কোম্পানিগুলোর প্রশাসনিক খরচও অর্ধেকে নেমে আসবে।

অত্যন্ত চাহিদাপূর্ণ এবং নিয়ন্ত্রিত সাতটি পেশার ক্ষেত্রে—যথা চিকিৎসক, নার্স, দন্ত চিকিৎসক, ধাত্রী, ভেটেরিনারি সার্জন (প্রাণী চিকিৎসক), ফার্মাসিস্ট এবং স্থপতি—ডিপ্লোমাগুলো যদি পূর্ব-স্বীকৃত প্রোগ্রাম থেকে আসে এবং ন্যূনতম ইউরোপীয় মানদণ্ড পূরণ করে, তবে তাদের স্বীকৃতির প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় হতে পারে।

এই প্যাকেজে ইউরোপীয় শ্রম কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা আরও জোরদার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কর্তৃপক্ষ এখন থেকে পরিদর্শনের প্রস্তাব দিতে পারবে, ইউরোপীয় ডেটা ও ডাটাবেসে প্রবেশাধিকার পাবে এবং তৃতীয় দেশ থেকে আসা দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ কর্মীদের সুরক্ষায় তাদের ম্যান্ডেট বা এখতিয়ার প্রসারিত করতে পারবে।

এর আগে ২০২১ সালে এই কর্তৃপক্ষ প্রায় ২৫,০০০ কর্মীকে কভার করে ৩৪৭টি সীমান্ত পেরিয়ে শ্রম পরিদর্শন পরিচালনা করেছিল এবং মজুরি প্রদানে বিলম্ব, কম মজুরি দেওয়া ও অননুমোদিত কাজের বেশ কিছু ঘটনা উদ্ঘাটন করেছিল।


শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version