বৃহস্পতিবার, ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ৩০ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দীর্ঘ প্রতীক্ষা, মতভেদ ও রাজনৈতিক সমঝোতার পর চলতি বছরের জুনে কার্যকর হতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন অভিবাসন ও আশ্রয়নীতি। তবে এই নীতি কার্যকর করাই এখন ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন নীতিনির্ধারণী কেন্দ্র-আইসিএমপিডি’র মহাপরিচালক সুসান রাব। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, অভিবাসন কখনোই এমন কোনো সমস্যা নয়, যা একবারে বা স্থায়ীভাবে শেষ হয়ে যায়। বরং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে এটি যে কোনো সময় নতুন মাত্রা নিতে পারে।

নতুন নীতির বড় পরীক্ষা

দীর্ঘ সময়ের সিদ্ধান্তহীনতা ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মতবিরোধের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। এই চুক্তিকে ঘিরেই এখন ইউরোপের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। উল্লেখ্য, ভিয়েনাভিত্তিক আইসিএমপিডি ইউরোপে অভিবাসন নীতিনির্ধারণ ও গবেষণার অন্যতম প্রধান সংস্থা, যা ইইউ ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে।

অভিবাসন কমলেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশকারী অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে আশ্রয়প্রার্থীর আবেদনও কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। গত ১৬ জানুয়ারি ব্রাসেলসে ইতালির বার্তা সংস্থা আনসা-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুসান রাব বলেন, এসব পরিসংখ্যান অভিবাসন প্রবণতায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও এগুলোকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। তার ভাষায়, সংখ্যাকেই শেষ কথা বলে ধরে নেওয়া যাবে না। এখন ইউরোপের গতি কমানোর কোনো সুযোগ নেই। আত্মতুষ্টিতে ভোগার সময়ও নয়।

জোরপূর্বক অভিবাসনের মূল কারণ

সুসান রাব বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। তার মতে, জোরপূর্বক অভিবাসনের প্রধান কারণ এখনো সংঘাত, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। তিনি সতর্ক করে বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে অভিবাসনের ধারা খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে। ফলে ইউরোপকে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে, যাতে হঠাৎ করে চাপ বেড়ে গেলে তা সামাল দেওয়া যায়।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা প্রত্যাবাসন

নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। হাঙ্গেরিসহ কয়েকটি দেশের আপত্তি সত্ত্বেও এই চুক্তিকে ইউরোপের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক মাইলফলক বলে উল্লেখ করেছেন সুসান রাব। তিনি বলেন, যে কোনো বড় রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রেই শুরুতে অনীহা থাকে। এই চুক্তিও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তার মতে, প্রত্যেকে নিজের মতো করে চলবে, এই ধারণার যুগ শেষের পথে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পারছে, ২৭টি আলাদা নীতির চেয়ে একটি যৌথ নীতি অনেক বেশি কার্যকর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইইউর অভিবাসন নীতির বিশ্বাসযোগ্যতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। বর্তমানে ইউরোপে প্রত্যাবাসনের হার প্রায় ২৭ শতাংশ, যা ২০১৯ সালের পর সর্বোচ্চ। সদস্য রাষ্ট্রগুলো এই হার আরও বাড়াতে চায়।

সাফল্যের চাবিকাঠি

আইসিএমপিডি’র কাজের মূল ভিত্তি হলো সমগ্র অভিবাসন ব্যবস্থায় সহযোগিতা জোরদার করা। সুসান রাব বলেন, মূল দেশ, ট্রানজিট দেশ ও গন্তব্য দেশ, এই তিন পক্ষের সমানভাবে একসঙ্গে কাজ করা অত্যন্ত জরুরি। পুরো অভিবাসনপথজুড়ে প্রকৃত সহযোগিতা না থাকলে কোনো নীতিই কার্যকর হবে না। এই সমন্বয়ের ক্ষেত্রেই আইসিএমপিডি নিজেদের শক্তিশালী ভূমিকার কথা তুলে ধরে। ভিয়েনা থেকে সংস্থাটি বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

নতুন চুক্তি কার্যকর হলেও ইউরোপের অভিবাসন পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটছে না। ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা, ইরান, সিরিয়া ও সুদানের মতো দেশগুলোর সংঘাত ও অস্থিরতার কারণে ইউরোপে অভিবাসনের চাপ অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ ইউক্রেনীয় ইউরোপে বসবাস করছেন। অন্যদিকে স্পেনে আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে ভেনেজুয়েলার নাগরিকেরা উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে রয়েছেন। আফ্রিকার সুদান থেকেও অভিবাসনের প্রবাহ বাড়ছে। সুসান রাব বলেন, গত কয়েক বছরে আমরা অনেকটাই সঠিক পথে এগিয়েছি। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই গতি ধরে রাখা।

একই সঙ্গে তিনি আবারও সতর্ক করে বলেন, অভিবাসন কখনোই সহজে বা একবারে সমাধান হয়ে যাওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। এটি ইউরোপের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও চলমান চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version