বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক অবস্থান গভীর সংকটের মুখে পড়েছে, এমন তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো একাধিক প্রতিবেদনে এনেছে। এর ফলে তাঁকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পদত্যাগ করতে হতে পারে এমন সঙ্কেতও উঠে এসেছে, যদিও তিনি এখনো স্পষ্টভাবে তা অস্বীকার করেছেন।

এই পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বড় কেলেঙ্কারি, প্রাক্তন মন্ত্রী এবং লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, যার পেছনে জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য এসেছে সাম্প্রতিক ফাইলগুলিতে। ম্যান্ডেলসনকে স্টারমার সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাজদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়ায় বিরোধী দলসহ দলটির ভিতর থেকেও কঠিন প্রশ্ন ও সমালোচনা উঠেছে।

ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগের পেছনে স্টারমারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হলো, তিনি এমন একজনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত করেছেন যিনি দোষী সাব্যস্ত স্পর্শকাতর ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন বলে ফাইলে উঠে এসেছে, যদিও সরাসরি স্টারমারের নাম নেই।

ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগের পর নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্টারমারের ঘনিষ্ঠ সহকারী ও চিফ অব স্টাফ মরগ্যান ম্যাকসুইনি পদত্যাগ করেছেন। এই নিয়োগের সিদ্ধান্তে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে জানা গেছে। এদিকে বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও বিরোধী দলগুলোর তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী টরি পার্টি এবং লেবার দলের সমালোচনামুখর গণমাধ্যমগুলো বলছে, এই ঘটনা স্টারমারের নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। স্কটল্যান্ডের লেবার নেতা আনাস সারওয়ারও স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাঁর মতে, চলমান এই বিতর্ক দলের ঐক্য ও সরকারের কাজকর্ম ব্যাহত করছে।

সমালোচনার মধ্যেও স্টারমার এখন পর্যন্ত পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন যে তিনি তার দায়িত্ব থেকে কোনো অবস্থায় সরে যাবেন না এবং তিনি তাঁর সরকারের কাজ চালিয়ে যাবেন। ডাউনিং স্ট্রিটের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, স্টারমারের মনোবল আত্মবিশ্বাসী এবং তিনি দেশের জন্য কাজ চালিয়ে যাবেন, পদত্যাগের কোনো পরিকল্পনা নেই।

স্টারমারের নেতৃত্বের প্রতি চাপ থাকলেও অধিবেশনে সরাসরি ইতিবাচক সমর্থনও রয়েছে। তাঁর কেবিনেট সদস্যদের একাংশ ও লেবার পার্টির মাইনস্ট্রিম সদস্যরা তাঁকে সমর্থন জানিয়েছেন, এমন খবরও পাওয়া গেছে। তবে লেবার দলের ভেতরে বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান। কিছু মন্ত্রীর মধ্যে অশান্তি ও পরিকল্পনা বদলানো নিয়ে আলোচনাও চলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের অবস্থান এখন অনিশ্চিত প্রতিযোগিতার মুখে। যদি তিনি পদত্যাগ করেন, তাহলে লেবার পার্টির ভেতরে নেতৃত্বের বড় বদল আসতে পারে এবং সেই পরিবর্তন আগামী একটি সাধারণ নির্বাচনেও বড় প্রভাব ফেলবে। আর যদি তিনি টিকে থাকেন, তবুও দলের ভেতরে এবং প্রকাশ্য জনমত শক্তিশালী নেতার জন্য চাপ বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচন ও স্থানীয় ভোটে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আনতে পারে। অর্থনৈতিক অসন্তোষও বাড়তে পারে, কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা পাউন্ড স্টার্লিং ও সরকারি বন্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যার প্রভাব বাজারেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বর্তমানে সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গসহ একাধিক সূত্র বলছে, স্টারমারকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পদত্যাগ করতে হতে পারে, যদিও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ও কার্যালয় তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা জানাচ্ছেন, ভবিষ্যৎ সপ্তাহগুলো, বিশেষ করে পার্লামেন্টের অধিবেশন, মন্ন্ডেলসন তদন্তের ফলাফল এবং লেবার পার্টির ভোট, স্টারমারের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

কয়েক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একাংশ মনে করতেন স্টারমারের অবস্থান স্থির। কিন্তু ম্যান্ডেলসন-এপস্টিন বিতর্ক, দলের অভ্যন্তরীণ চাপ ও জনমতের অস্থিরতা একযোগে বিরাট রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি করেছে। পদত্যাগের সম্ভাবনা যত কম নয়, আর তা তিনি নিজে টালাতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্বের ওপর চাপ, রাজনৈতিক ক্ষত ও জনমতের ক্ষোভ বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version