ইউরোপজুড়ে গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহের সঙ্গে একের পর এক ভয়াবহ দাবানল নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ বেলজিয়ামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাবানল। পিটল্যান্ড ও পাইন বনসহ প্রায় ৩ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে এতে। প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার তীব্র তাপদাহের পর শুরু হওয়া এই আগুনের কারণে সীমান্তবর্তী ওয়াইমস ও বুটজেনবাখ এলাকা থেকে অন্তত ৬০০ বাসিন্দা ও পর্যটককে সরিয়ে নিতে হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জরুরি উদ্ধারকারী দলও কাজ করেছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও কিছুটা ঠান্ডা আবহাওয়া পরিস্থিতিতে স্বস্তি দিলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
তবে বেলজিয়ামের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। উত্তর গোলার্ধজুড়েই এখন দেখা যাচ্ছে চরম আবহাওয়ার প্রভাব। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী তাপদাহ, খরা ও দাবানল, আবার কোথাও আকস্মিক অতিবৃষ্টি ও বন্যা। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্থলভাগ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলে উচ্চ ও নিম্নচাপ ব্যবস্থার দীর্ঘ সময় একই এলাকায় স্থির হয়ে থাকা। বিশেষ করে স্থায়ী উচ্চচাপ গরম ও শুষ্ক বাতাসকে আটকে রাখে, ফলে তাপদাহ দিনের পর দিন, এমনকি সপ্তাহজুড়ে স্থায়ী হতে পারে।
এর প্রভাব পড়ছে মাটির আর্দ্রতা ও নদ-নদীর পানির স্তরেও। ইউরোপের অনেক এলাকায় মাটি শুকিয়ে যাচ্ছে, প্রধান নদীগুলোর পানির স্তরও অস্বাভাবিকভাবে কমছে। আর শুষ্ক এই পরিবেশ দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করছে। আগুনের ধোঁয়া ও দূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইউরোপের এই তীব্র গরমের জন্য প্রায়ই এল নিনোর প্রভাবের কথা বলা হয়। তবে জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, ইউরোপের গ্রীষ্মকালীন তাপদাহ ও দাবানলের সঙ্গে এল নিনোর সরাসরি সম্পর্ক খুব শক্তিশালী নয়। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা পরিবর্তনের এই প্রাকৃতিক চক্র বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেললেও ইউরোপে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে পরোক্ষ। বিশেষ করে গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহের প্রধান কারণ হিসেবে একে দেখা যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে বাড়তে থাকা তাপদাহ ও দাবানলের মূল কারণ স্থানীয় আবহাওয়াগত পরিস্থিতি এবং মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন। বায়ুমণ্ডলে স্থায়ী উচ্চচাপ, মাটি ও পিটল্যান্ডের গভীর শুষ্কতা এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন—সব মিলিয়েই পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক চক্র সাময়িকভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখলেও, ইউরোপের তাপদাহ ও দাবানলের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে জলবায়ু পরিবর্তন ও বদলে যাওয়া আবহাওয়ার ধরন।
