সংখ্যালঘু সরকারের প্রস্তাবিত আবাসন সহায়তা বিল পার্লামেন্টে বাতিল হওয়ার পর আগামী ২৯ নভেম্বর স্পেনে আগাম সাধারণ নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
ইউরোপে এখনও ক্ষমতায় থাকা গুটিকয়েক বামপন্থি সরকারপ্রধানদের অন্যতম এই সোশ্যালিস্ট নেতার জন্য গত শুক্রবারের এই পরাজয় ছিল সর্বশেষ বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। ২০১৮ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা সানচেজ সোমবার টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, ‘আরও বেশি কাজ করার জন্য আমাদের জনগণের সমর্থনকে পুনরুজ্জীবিত ও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।’ তিনি জানান, তাঁর মূল লক্ষ্য হলো ‘পার্লামেন্টে আরও বিস্তৃত ও প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা।’
এর আগে শনিবার সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে রাজধানী মাদ্রিদসহ স্পেনের বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করেন। সরকারি প্রস্তাবনায় বাড়িভাড়ার চুক্তির মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন এবং অসহায় ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল; যা স্পেনের পার্লামেন্টে বিরোধী দলগুলোর ভোটে বাতিল হয়ে যায়। এই ব্যর্থতা দেশটির ব্যয়বহুল আবাসন বাজারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং একই সঙ্গে আইন পাসের ক্ষেত্রে সানচেজের সংখ্যালঘু জোট সরকারের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দেয়।
সানচেজ সরকার পাস করা সর্বশেষ জাতীয় বাজেট ২০২৩ সাল থেকেই স্পেন কোনো নতুন বাজেট ছাড়া চলছে। গত মাসে মাদ্রিদের একটি ফ্ল্যাট থেকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বসবাস করা ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকাল নামের এক বৃদ্ধাকে উচ্ছেদ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সপ্তাহব্যাপী জনঅসন্তোষ শুরু হয়েছিল, যা এই বিক্ষোভের মাধ্যমে তীব্র আকার নেয়। সংস্কারের দাবিতে মাদ্রিদের কেন্দ্রস্থলে এক সপ্তাহ আগে গড়ে তোলা তাঁবুর শহরে শত শত বিক্ষোভকারী এখনও অবস্থান করছেন।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে প্রধান বিরোধী দল রক্ষণশীল পপুলার পার্টিকে (পিপি) ক্ষমতাসীন সোশ্যালিস্টদের চেয়ে এগিয়ে রাখা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের মতো স্পেনেও চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম সাধারণ মানুষের উদ্বেগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিয়েল এস্টেট ওয়েবসাইট আইডিয়ালিস্টা (Idealista)-র মতে, স্পেনে গত এক দশকে গড় বাড়িভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং বাড়ি বিক্রির দাম বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ।
আবাসন অধিকার আন্দোলনকর্মীদের মতে, পেনশনভোগী বৃদ্ধা আবাসকাল সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে বাস করা ফ্ল্যাটটি ছাড়তে বাধ্য হন যখন একটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ভবনটি কিনে নিয়ে তাঁর বাড়িভাড়া ২৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তীব্র জনরোষের মুখে নতুন মালিকপক্ষ পরবর্তীতে কম ভাড়ায় তাঁকে ফ্ল্যাটে ফিরে আসার অনুমতি দিয়ে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়েছিল।
কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদী দল ‘জুনটস’—যাদের সমর্থনের ওপর সানচেজ সরকার নির্ভর করছিল—তারা সরকারের বিপক্ষে ভোট দেওয়ায় আবাসন বিলটি বাতিল হয়ে যায়। দলটির যুক্তি ছিল, বিলটি তাড়াহুড়ো করে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি আবাসন সংকটকে আরও খারাপ করে তুলবে।
ভাষণে সানচেজ তাঁর সরকারের সফলতার পক্ষে যুক্তি দিয়ে উল্লেখ করেন যে তাঁর নেতৃত্বে স্পেনের অর্থনীতি প্রধান ইউরোপীয় দেশগুলোর চেয়েও দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তবে ক্ষমতায় থাকার আট বছরে তাঁর স্ত্রী এবং সোশ্যালিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের দুর্নীতির কেলেঙ্কারির কারণেও চাপের মধ্যে রয়েছেন সানচেজ।
এ ছাড়া উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সিউটায় অভিবাসী সংকট সামাল দেওয়ার ব্যর্থতা নিয়েও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী; যেখানে জুলাইয়ের শেষের দিকে মরক্কো থেকে হাজার হাজার অভিবাসী প্রবেশ করেছিল। আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপের এই স্থল সীমান্তে পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হয়েছে এবং বহু অভিবাসী এখনও অস্থায়ী শিবিরে রাত কাটাচ্ছে। এই পরিস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা উসকে দিয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবিতে সেখানে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ হচ্ছে।
বিরোধী পপুলার পার্টির প্রধান আলবার্তো নুনেজ ফিজো শনিবার সানচেজকে অবিলম্বে নির্বাচনের ডাক দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, দেশটি ‘আর সহ্য করতে পারছে না।’ জনমত জরিপে পিপি এগিয়ে থাকলেও তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে সরকার গঠনে তাদের উগ্র ডানপন্থি দল ‘ভক্স’-এর সমর্থনের প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
