জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পশ্চিম ইউরোপ এ বছর জুন ও জুলাইয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ সময় পার করেছে। একই সঙ্গে তীব্র খরা ও দাবানলে বিপর্যস্ত হয়েছে অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস (সিসিএস) গতকাল সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে।
কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, জুন-জুলাইয়ে পশ্চিম ইউরোপের গড় তাপমাত্রা ২১ দশমিক ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। এটি আগের রেকর্ড ২০২২ সালের তুলনায়ও বেশি। দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণেই এবার তাপমাত্রা এতটা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহ ও খরা একে অপরকে আরও তীব্র করে তুলছে। মাটিতে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও শুষ্ক হয়ে উঠছে, যা দাবানল ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফ্রান্স, স্পেন, অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরিসহ পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গত জুলাইয়ে চরম শুষ্কতা দেখা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের বিভিন্ন নদীতেও পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। ফ্রান্সের সেইন, জার্মানির রাইন এবং দানিউব নদী খরায় বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নৌপরিবহন, কৃষিতে সেচ এবং জ্বালানি উৎপাদনে।
তীব্র গরম ও শুষ্কতার কারণে এ বছর ইউরোপের দাবানলও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও স্পেনে বড় ধরনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। কোপার্নিকাস বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে দাবানল ছড়ানোর উপযোগী গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং এর ফলে দাবানলের মৌসুমও দীর্ঘ হচ্ছে।
সমুদ্রেও রেকর্ড উষ্ণতা
শুধু স্থলভাগ নয়, জুলাইয়ে বিশ্বের সমুদ্রগুলোর তাপমাত্রাও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ওই মাসের আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর প্রভাবকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। কোপার্নিকাসের পরিচালক কার্লো বুয়োনতেম্পো বলেন, ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা এল নিনোর প্রভাব এখন বৈশ্বিক তাপমাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের উষ্ণ পর্যায়। এ সময় ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা ও অন্যান্য চরম আবহাওয়া দেখা দিতে পারে।
বুয়োনতেম্পোর মতে, এল নিনো এবং মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বাড়তে থাকা গ্রিনহাউস গ্যাস—দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। কোপার্নিকাসের তথ্য বলছে, চলতি বছরের শেষ দিকে বা ২০২৭ সালের শুরুতে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রায় নতুন রেকর্ড হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে—চরম তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানল এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে এগুলোর প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।
