ইউরোপজুড়ে জন্মহারের আশঙ্কাজনক পতন এখন কেবল পারিবারিক আলোচনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রগুলো সচল রাখতে যেখানে প্রতি মহিলার গড়ে ২ টির বেশি সন্তান জন্ম দেওয়া প্রয়োজন, সেখানে ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্ধেক পরিবারেরই সন্তান মাত্র একটি।
চেক প্রজাতন্ত্র থেকে শুরু করে হাঙ্গেরি পর্যন্ত দেশগুলো মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি এবং তরুণ দম্পতিদের সহজ ঋণের মতো নানা প্রলোভন দেখালেও ফলাফল খুব একটা আশাব্যঞ্জক হচ্ছে না। ফিনিশ জনসংখ্যাবিদ আনা রোটকির্চ এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান লালন-পালনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং কর্মজীবনে ফেরার অনিশ্চয়তা তরুণদের পরিবার শুরুর সিদ্ধান্তকে বাধাগ্রস্ত করছে।
দীর্ঘদিন ধরে নর্ডিক দেশগুলোর উদার সামাজিক সুবিধা এবং সহজলভ্য শিশুযত্ন ব্যবস্থাকে আদর্শ মনে করা হলেও সাম্প্রতিক উপাত্ত বলছে, এই ‘নর্ডিক মডেল’ও এখন ব্যর্থ হতে শুরু করেছে। নরওয়ে বা ফিনল্যান্ডের মতো দেশেও জন্মহার দ্রুত কমছে। গবেষক পিটার ভ্যানহুইস এই পরিস্থিতিকে ‘নর্ডিক প্যারাডক্স’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র কেবল কত টাকা দিচ্ছে সেটিই বড় কথা নয়; বরং ডায়াপার থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি পর্যন্ত বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত খরচ এবং সন্তানকে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় ও শক্তির অভাব এখন বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসন সংকট এবং বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের ব্যাপারে সন্দিহান করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তার চেয়ে মানসম্মত ও সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ‘চাইল্ড কেয়ার’ বা শিশুযত্ন কেন্দ্রগুলোর পরিধি বাড়ানো বেশি কার্যকর। কারণ আজকের অর্থনীতিতে একটি সংসার চালাতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের আয় অপরিহার্য।
তবে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে বাবা-মায়েরা আর্থিক বা ক্যারিয়ারের চাপে না পড়ে নিজেদের ইচ্ছামতো সন্তান লালন-পালনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। নতুবা পর্যাপ্ত তরুণ করদাতার অভাবে ভবিষ্যতে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো মৌলিক খাতগুলো মুখ থুবড়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
