আগামী ১০ বছরে ইউরোপের পর্যটন শিল্প কোন দিকে মোড় নেবে? নতুন এক গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, বিশ্বজুড়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাদেশটির আকর্ষণ আরও বাড়বে। হসপিটালিটি গ্রুপ ‘অ্যাকর’-এর প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, আগামী ১০ বছরে ইউরোপে পর্যটকদের আবাসনের চাহিদা এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পাবে এবং একই সঙ্গে মহাদেশটির অভ্যন্তরীণ ভ্রমণও বাড়বে।
‘২০৩৬ সাল নাগাদ ইউরোপের পর্যটন মানচিত্রের পরিবর্তনশীল রূপ’ শীর্ষক তাদের নতুন প্রতিবেদনে এই গ্রুপটি জানিয়েছে যে, ইউরোপ ‘আগামী দশকেও বৈশ্বিক ভ্রমণ শিল্পের পাওয়ার হাউস বা মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বহাল থাকবে।’
‘ট্যুরিজম ইকোনমিকস’-এর তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ থেকে ২০৩৬ সালের মধ্যে রাতযাপনের সংখ্যা ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, যা প্রতি বছর অতিরিক্ত ১৬০ কোটি (১.৬ বিলিয়ন) রাতযাপনের সুযোগ তৈরি করবে। এছাড়া হোটেল আবাসন আরও দ্রুতগতিতে ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালে ইউরোপে ৮১ কোটি (৮১০ মিলিয়ন) আন্তর্জাতিক পর্যটক এসেছিলেন, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি। এটি বিশ্বব্যাপী মোট আন্তর্জাতিক পর্যটকের ৫৩ শতাংশ আকর্ষণ করেছিল এবং আন্তর্জাতিক পর্যটন খাত থেকে ৭০ হাজার কোটি (৭০০ বিলিয়ন) ইউরোরও বেশি আয় তৈরি করেছিল।
অ্যাকর জানিয়েছে, ‘ভ্রমণ প্রবাহের পরিবর্তন, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ, নতুন গন্তব্যের উত্থান এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চলাচলের মতো বিভিন্ন উপাদানের ওপর ভর করে এই প্রবৃদ্ধি ঘটছে।’
সংস্থাটি আরও বলে, ‘পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ইউরোপের মূল শক্তি এর বৈচিত্র্যের মধ্যে। তুলনামূলকভাবে একটি সংক্ষিপ্ত ভৌগোলিক পরিসরে খুব কম অঞ্চলেই এমন বৈচিত্র্যময় পর্যটন সুবিধা রয়েছে।’ তাদের মতে, ‘বিশ্বমানের প্রবেশদ্বার শহরগুলো থেকে শুরু করে সমুদ্রসৈকত, স্কি রিসোর্ট, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, জাতীয় উদ্যান, ঐতিহ্যবাহী পর্যটন, খাদ্য পর্যটন কিংবা উৎসব—ইউরোপের ভূপ্রকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতির অনন্ত বৈচিত্র্যময় রূপই পর্যটকদের কাছে এর চিরন্তন আকর্ষণের উৎস।’
অ্যাকরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১০ বছরে সব ধরনের পর্যটন আবাসনে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের কাটানো রাতের সংখ্যা ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এর বিপরীতে অভ্যন্তরীণ ছুটি কাটাতে যাওয়া পর্যটকদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার কিছুটা ধীরগতিতে ২৪ শতাংশ হবে।
তবে নতুন পর্যটকদের মধ্যে ইউরোপের ভেতরের ভ্রমণকারীদের আধিপত্যই সবচেয়ে বেশি থাকবে। তথ্যানুযায়ী, আগত পর্যটকদের ৭৭ শতাংশই হবেন মহাদেশটির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ দর্শনার্থী। এর মধ্যে জার্মানি সবচেয়ে শক্তিশালী উৎস হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে, যেখান থেকে মোট আগমনের ১৪ শতাংশ পর্যটক আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে; এর পরেই রয়েছে ব্রিটিশ (৮%) ও ফরাসি (৫%) পর্যটকরা। এছাড়া শীর্ষ পাঁচের বাকি দুটি অবস্থানে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র (৫%) এবং নেদারল্যান্ডসের (৪%) পর্যটকরা।
দেশভিত্তিক গন্তব্যের ক্ষেত্রে ২০৩৬ সালের মধ্যে ফ্রান্স ও পোল্যান্ড উভয়ের জন্যই জার্মানি বৃহত্তম পর্যটক সরবরাহকারী দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে জার্মানির পর্যটনের জন্য নেদারল্যান্ডস শীর্ষে থাকবে; স্পেনের জন্য সবচেয়ে বড় উৎস হবেন ব্রিটিশ পর্যটকরা এবং যুক্তরাজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় উৎস হবেন মার্কিন ভ্রমণকারীরা।
মহাদেশটির নতুন ও বিকাশমান পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানির মতো দেশগুলো শীর্ষ চাহিদায় থাকবে বলে ধারণা করা হলেও, আগামী ১০ বছরে আজারবাইজানে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের রাতযাপনের সংখ্যা ১১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে লাটভিয়ায় এই প্রবৃদ্ধি ৮৩ শতাংশ এবং রোমানিয়ায় ৮২ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ইউরোপের বাইরের আন্তর্জাতিক উৎস বাজারগুলো থেকেও চাহিদায় কোনো ঘাটতি দেখা যাবে না। আগামী দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া থেকে পর্যটকদের আগমন আকাশচুম্বী হবে, যা যথাক্রমে ৯৩ এবং ৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে ইউরোপে সৌদি পর্যটকদের সংখ্যা ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, আর চীন থেকে পর্যটকদের আগমন অবিশ্বাস্যভাবে ১৩৮ শতাংশ বেড়ে যাবে।
একই সময়ে আফ্রিকা থেকে পর্যটক আগমন ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে; অন্যদিকে দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকা থেকে আগতদের সংখ্যা বাড়বে যথাক্রমে ৪২ এবং ২৬ শতাংশ।
