বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সম্প্রতি বিশ্ব বাণিজ্য ও কূটনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর শুল্ক নীতি এবং অস্থির বিশ্বনীতি–এর প্রভাবের সামনে ইউরোপীয় দেশগুলো চীনমুখী কৌশল গ্রহণ করছে, একদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে পুনরায় ব্যালান্স করার প্রয়াস দেখা যাচ্ছে।

ট্রাম্পের শুল্কনীতি

ট্রাম্প প্রশাসন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন পণ্য ও দেশের বিপরীতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের মধ্যে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, যা ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে নতুন কৌশল অবলম্বনের প্রবণতা বাড়িয়েছে।  বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই চাপ ইউরোপের একাংশকে  ব্যক্তিগত স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প খুঁজতে  উদ্বুদ্ধ করেছে, যেটির অন্যতম বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে চীনের সঙ্গে গুরত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব।

যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ২০১৮ সালের পর প্রথমবার চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। তিনি বেইজিং সফরে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন এবং মানবাধিকার ও হংকং বিষয়ে বিরোধ নিরপেক্ষ রেখে বাস্তব ও গঠনমূলক সম্পর্কের আহ্বান জানিয়েছেন। চীনের পক্ষ থেকেও ব্রিটিশ এমপিদের ওপর থাকা কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে—যা কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন ধারা নির্দেশ করে।  এছাড়া ব্যবসা, পরিষেবা এবং বিনিয়োগ ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যেমন বৃহৎ স্কচ হুইস্কি রফতানি ও ভিসা নীতিতে নরম অবস্থান।

কানাডা: নতুন কৌশলগত সখ্যতা

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও সম্প্রতি চীন সফর করেছেন এবং বেইজিং, ওটাও ‘নতুন কৌশলগত অংশীদারত্ব’ চালু করেছেন, যা আমেরিকার শুল্ক চাপের পরিপ্রেক্ষিতে কানাডার অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। এই অংশীদারিত্বে দুই দেশ ক্লিন এনার্জি, কৃষি ও আধুনিক প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ ও শুল্ক হ্রাস-এর মতো বিষয়গুলোতে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে, যা কানাডার জন্য বাণিজ্যিক বিকল্পকে আরও শক্তিশালী করবে।

বিনিয়োগ ও বাণিজ্য

ইউরোপের বিভিন্ন কোম্পানিও চীনের বাজারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। যেমন ব্রিটিশ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান- স্ক্রোডার্স চীনের ব্যাটারি নির্মাতা সিএটিএল–এর সঙ্গে ব্যাটারি স্টোরেজ প্রকল্পে অংশ নিচ্ছে।  জার্মান ফার্মগুলোও চীনে প্রায় চার বছর ধরে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে, বিশেষ করে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও স্থানীয় সরবরাহ শৃঙ্খলা গঠনে, যা ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বাজার সংযুক্তির একটি নতুন অধ্যায় নির্দেশ করে।

ইউরোপের নীতি ব্যালান্স

যদিও কিছু দেশ চীনমুখী কৌশল গ্রহণ করছে, জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে জার্মানি এখনও সংযুক্তরাষ্ট্রকে চীনের তুলনায় প্রাধান্য দেয়, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে। তিনি সতর্ক করেছেন যে অতিরিক্তভাবে চীনের ওপর নির্ভরতা গ্রহণ করা “ভুল” সিদ্ধান্ত হতে পারে।  এটি দেখায় ইউরোপে পুরোপুরি চীনমুখী হওয়া নয়, বরং একটি দ্বিমুখী কৌশলগত ব্যালান্সিং চলছে, যেখানে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে চীনের সাথে সম্পর্ক শক্ত রেখে নিরাপত্তা ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগত মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হচ্ছে।

বিশ্ব মানচিত্রে নতুন স্থিতিমাপক

চীনের দিকে ইউরোপের এই শিফট এমন কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক নীতি ও অস্থির সিদ্ধান্ত সামগ্রিকভাবে দেশগুলোকে নতুন বিকল্প খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করেছে, যেখানে বেইজিংয়ের শক্তিশালী অর্থনৈতিক মাধ্যম, নীতি নমনীয়তা ও ব্যবসায়িক সুযোগগুলোর গুরুত্ব বাড়ছে।এই নতুন বাস্তবতায় শুধুমাত্র বাণিজ্য নয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কগুলোও পরিবর্তনের পথে, এবং ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিকল্পনায় এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেখা যাবে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version