বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো অভিবাসীদের কাছ থেকে অর্থ চুরির গুরুতর অভিযোগে দেশটির অভিবাসন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মানবিক সংকটের মুহূর্তে দায়িত্বে অবহেলার পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহারের এই অভিযোগ যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, ছয়জন অভিবাসন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি অর্থ চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি আরও পাঁচজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চুরির ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেটস কোর্টে হাজির করা হয়।

আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কৌঁসুলি রোজালিন্ড ইয়ারিস বলেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা ছোট নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসীদের কাছ থেকে উদ্ধারকালে তাদের ব্যক্তিগত অর্থ আত্মসাতের জন্য পরস্পরের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কেন্টের ডোভার বন্দরে পৌঁছানো অভিবাসীদের কাছ থেকেই এই অর্থ চুরি করা হয়। উদ্ধার ও প্রাথমিক প্রক্রিয়ার সময় অভিবাসীদের কাছ থেকে জব্দ করা নগদ অর্থ, যা পরে ফেরত দেওয়ার কথা ছিল, সেটিই আত্মসাৎ করা হয় বলে অভিযোগ।

এই অনিয়মের বিষয়টি প্রথমে নজরে আসে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–এর দুর্নীতিবিরোধী পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তে। তদন্তে উঠে আসে, দায়িত্ব পালনকালে উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে অর্থ আত্মসাৎ করতেন।

এই ঘটনায় হোম অফিস জানিয়েছে, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অভিবাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ তদারকি আরও জোরদার করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

২৯ জানুয়ারি বিচারক পল গোল্ডস্প্রিং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের জামিনে মুক্তি দেন। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ২৬ ফেব্রুয়ারি। বিচার চলাকালে এই ঘটনায় যুক্তরাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর ভূমিকা গভীরভাবে পর্যালোচিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

২০১৮ সাল থেকে ছোট নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিপজ্জনক এই সমুদ্রপথে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও হাজারো মানুষ আশ্রয়ের আশায় যুক্তরাজ্যের দিকে পাড়ি জমাচ্ছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে ২৮ হাজারের বেশি অভিবাসী ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে পৌঁছান, যা তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ছিল। ২০২২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে রেকর্ড ৪৫ হাজারের বেশি–তে পৌঁছায়। ২০২৪ সালে আগমন ঘটে ৩৬ হাজার ৫৬৬ জনের। এরপর ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ হাজার ৪৭২ জনে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। এই বাড়তি চাপের মধ্যেই অভিবাসীদের অর্থ চুরির মতো ঘটনা সামনে আসায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নৈতিকতা ও মানবিক মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্রিটিশ সরকার আশ্রয়নীতিতে একের পর এক কঠোর নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করেছে। গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে ঘোষিত নতুন পরিকল্পনায় বলা হয়, স্থায়ী বসবাসের পথে থাকা অভিবাসীদের রেসিডেন্স পারমিটের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে দুই বছর ছয় মাস করা হবে। আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নজরদারি ও যাচাই প্রক্রিয়া আরও কড়াকড়ি করা হবে।

সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপ অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করবে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অভিবাসন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সাম্প্রতিক অভিযোগ প্রমাণ করে কেবল কঠোর নীতি নয়, বরং দায়িত্বশীল ও মানবিক প্রয়োগই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version