বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইউরোপের দেশগুলো ‘ওভারট্যুরিজম’ বা অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ সামলাতে এক কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নেই ৪৫ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের রাত্রিযাপনের রেকর্ড করা হয়েছে।

পর্তুগাল, গ্রিস, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ডসহ এক ডজনেরও বেশি দেশ অতিরিক্ত পর্যটকের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় জরিমানা, পর্যটন কর এবং ক্রুজ শিপ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করছে। বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের ফলে স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি, পরিবেশের ক্ষতি এবং জনজীবনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

পর্তুগাল, বিশেষ করে লিসবন এবং আজোরস দ্বীপপুঞ্জে পর্যটনের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। পর্যটকদের চাপের কারণে স্থানীয়দের আবাসন সংকট দেখা দেওয়ায় সরকার লিসবন এবং আজোরসের নির্দিষ্ট এলাকায় স্বল্পমেয়াদী ভাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। লিসবনে রাত যাপনের জন্য এখন থেকে প্রতি রাতে ৪ ইউরো পর্যটন কর দিতে হয়। আজোরস দ্বীপপুঞ্জের নাজুক বাস্তুসংস্থান রক্ষায় পর্যটকদের সংখ্যা সীমিত করা হয়েছে।

গ্রিসের সান্তোরিনি, মাইকোনোস এবং ক্রিট দ্বীপে ক্রুজ শিপের ভিড় সামলাতে কঠোর হয়েছে প্রশাসন। সান্তোরিনিতে প্রতিদিন ক্রুজ যাত্রীর সংখ্যা ৮ হাজারে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। গ্রীষ্মকালে ২০ ইউরো পোর্ট ফি ধার্য করা হয়েছে। এথেন্সের ঐতিহাসিক স্থান অ্যাক্রোপলিসে ভিড় কমাতে নির্দিষ্ট সময়ের এন্ট্রি টিকিট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

ইতালির ভেনিস, ফ্লোরেন্স এবং রোমের মতো শহরগুলো অতিরিক্ত পর্যটনের শিকার। ভেনিসে যারা রাত না কাটিয়ে শুধু দিনে ঘুরতে আসেন, তাদের জন্য ৫-১০ ইউরো ‘ডে-ট্রিপার ফি’ চালু করা হয়েছে। সিনকুয়ে তেরের উপকূলীয় ট্রেইল বা রাস্তা ব্যবহারের জন্য ৭.৫০ থেকে ১৮.২০ ইউরো মূল্যের ‘সিনকুয়ে তেরে কার্ড’ কেনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের জন্য ফ্লোরেন্সে জাদুঘরের কর বাড়ানো হয়েছে।

ক্রোয়েশিয়ার ডুব্রোভনিকে প্রতিদিন মাত্র ২ থেকে ৩টি ক্রুজ শিপকে নোঙর করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় হস্তশিল্পের ঐতিহ্য বজায় রাখতে স্যুভেনির বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের জারমাট এবং ইন্টারলাকেন-এর মতো আল্পস অঞ্চলের গ্রামগুলোর সুরক্ষায় সেখানকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সরকার কাজ করছে। পিক সিজনে পর্যটক সংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা চলছে। পরিবেশবান্ধব যাতায়াত এবং দীর্ঘকালীন অবস্থানের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।

নেদারল্যান্ডসের অ্যামস্টারডাম শহর পর্যটনের চাপ কমাতে বেশ কঠোর হয়েছে। শহরের কেন্দ্রে হোটেল ভাড়ার ওপর ১২.৫ শতাংশ পর্যটন কর বসানো হয়েছে। ক্রুজ যাত্রীদের জন্য জনপ্রতি ১০০ ইউরো ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। শহরের মূল কেন্দ্রে বড় ক্রুজ শিপের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আয়ারল্যান্ডে পর্যটনের চাপ সারা বছরে ছড়িয়ে দিতে অফ-পিক সিজনে ভ্রমণের প্রচার চালানো হচ্ছে। ঐতিহাসিক স্থানে জোরে শব্দ বা অসভ্য আচরণের জন্য জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ক্লিফস অফ মোহার এবং নিউগ্র্যাঞ্জ-এর মতো জায়গায় পর্যটকদের দলগত আকার ছোট করা হয়েছে।

পুরো ইউরোপজুড়ে পর্যটনের প্রভাবে অতিষ্ঠ হয়ে বার্সেলোনা, পালমা এবং টেনেরিফের মতো শহরে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে নেমেছে। এর ফলে অনেক শহরে ডাইনামিক ট্যাক্স অর্থাৎ মৌসুমভেদে ট্যাক্সের পরিবর্তন এবং আউটডোর ডাইনিংয়ের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে।

২০২৫ সালে ইউরোপের এই পদক্ষেপগুলো একটি টেকসই পর্যটন শিল্প গড়ার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে। যদিও এতে ভ্রমণকারীদের খরচ কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু এটি ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে বলে সংশ্লিষ্ট ইউরোপিয় বিশেষজ্ঞদের মত।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version