সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও ফ্রান্সের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছিল অযাচিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত বাণিজ্যিক ফোন কল, যা ‘কোল্ড কলিং’ নামে পরিচিত। এবার এই উৎপাত বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির সরকার।
ফ্রান্সে কোল্ড কলিংয়ের যুগ এবার শেষ হতে যাচ্ছে, অন্তত এর বর্তমান রূপটি তো বটেই।
ইমানুয়েল ম্যাখোঁ সরকারের সমর্থনে আগামী ১১ আগস্ট (মঙ্গলবার) থেকে দেশটিতে একটি নতুন আইন কার্যকর হতে যাচ্ছে, যা এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিরক্তিকর ফোন কলগুলোকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করবে। এর মূল লক্ষ্য হলো ভোক্তাদের অযাচিত বাণিজ্যিক প্রচারণার হাত থেকে রক্ষা করা এবং দুর্বল বা সাধারণ মানুষকে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা।
এখন থেকে গ্রাহকদের পূর্বঅনুমতি ছাড়া তাঁদের ফোনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যোগাযোগ করা সম্পূর্ণ বেআইনি হবে। প্রতিযোগিতা, ভোক্তা অধিকার ও প্রতারণা নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চিফ অব স্টাফ অ্যালিস ভিলকট বলেন, এই সম্মতি ‘যেকোনো সময় প্রত্যাহার করা যেতে পারে’।
তবে কেবল দুটি ক্ষেত্রে এই ধরনের কল করার অনুমতি দেওয়া হবে: প্রথমত, যখন কোনো কোম্পানি ইতিমধ্যেই গ্রাহকের সম্মতি পেয়েছে (যেমন কোনো কেনাকাটার সময়, শপ পরিদর্শনের সময় বা কোনো ফর্ম পূরণের মাধ্যমে) এবং দ্বিতীয়ত, যখন কলটি গ্রাহকের ইতিমধ্যেই স্বাক্ষর করা কোনো চুক্তির সাথে সম্পর্কিত হবে।
৩ লাখ ৭৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত চড়া জরিমানা
সরকার জানায়, বছরের পর বছর ধরে চলা সাধারণ ভোক্তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতেই এই আইনটি করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের অনুমান, ফ্রান্সের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সেলস কল বা বিপণন কল পেয়ে থাকেন এবং অনেকেই এর চেয়েও বেশি পান।
জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ‘মিকোড’ তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে এই সমস্যাটি বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চালানো এক অনুসন্ধানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে এই কল ক্যাম্পেইনগুলো চলে; যার মধ্যে রয়েছে আগ্রাসী বিপণন কৌশল এবং ভুক্তভোগীদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখার নানা অপকৌশল।
এর আগে ২০২৪ সালে, ১১টি ভোক্তা অধিকার সংগঠন যৌথভাবে এই কল নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছিল। তারা ল্যান্ডলাইন এবং মোবাইল ফোনে অগণিত অনাকাঙ্ক্ষিত বিপণন কলের মাধ্যমে ‘ভোক্তাদের অবিরাম হয়রানি করার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’
এই নতুন আইন লঙ্ঘনের শাস্তি হবে অত্যন্ত কঠোর। কোনো ব্যক্তি এই আইন লঙ্ঘন করলে প্রতি কলের জন্য সর্বোচ্চ ৭৫,০০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। আর কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এই জরিমানার পরিমাণ প্রতি কলের জন্য সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৭৫ হাজার (৩৭৫,০০০) ইউরো পর্যন্ত হতে পারে।
বিগত ১৫ বছরে দেশটিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল: যেমন ০৬ বা ০৭ দিয়ে শুরু হওয়া মোবাইল নম্বর থেকে বিপণন কল করা নিষিদ্ধ করা এবং দিনের নির্দিষ্ট সময়ে বা সপ্তাহান্তে কল করা নিষিদ্ধ করা। তবে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল (যেমন ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ হিসাব, প্রতিবন্ধী বা প্রবীণদের জন্য ঘরের সংস্কার বা জ্বালানি-দক্ষ পুনর্নির্মাণ খাত)। কিন্তু এখন থেকে এটি প্রায় সব খাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
আরেকটি উদ্যোগ ছিল এমন একটি প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন করা যাতে কোম্পানিগুলো যোগাযোগ করতে না পারে (অপ্ট-আউট ব্যবস্থা)। এ বিষয়ে ফ্রান্সের অর্থ মন্ত্রণালয় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেছে, ‘আমরা এর মাধ্যমে একটি অপ্ট-আউট ব্যবস্থা থেকে পূর্বসম্মতি বা অপ্ট-ইন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছি।’
তবে ভোক্তা অধিকার সংস্থা ‘কো চয়েস’-এর মতে, লড়াই কেড়ে নেওয়া হবে না। সংস্থার সভাপতি মারি-অ্যামান্ডিন স্টিভেনিন সতর্ক করে বলেছেন, টেলিফোন কলের সুযোগ হারিয়ে ‘অনেক প্রতারক এখন তাদের কৌশল পরিবর্তন করবে এবং ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার বা ডোর-টু-ডোর ক্যানভাসিং করার চেষ্টা করবে।’ তিনি ইতিমধ্যেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি জানিয়েছেন।
মরক্কোর কল সেন্টার খাতে বড় ধাক্কা
ফ্রান্সের এই নতুন আইনটি মরক্কোয় বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটির কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইউনেস সেক্কুরি সংসদ সদস্যদের জানিয়েছেন, এর ফলে মরক্কোর কল সেন্টারগুলোতে কর্মরত প্রায় ৫০,০০০ মানুষের চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তিনি জানান, এই শিল্পখাতটি মরক্কোয় প্রায় ১০ কোটি (১০০ মিলিয়ন) ডলারের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করেছে এবং বার্ষিক ১০ কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব আয় করে থাকে। স্বল্প শ্রম ব্যয়, বিপুল সংখ্যক ফরাসিভাষী জনবল এবং তুলনামূলকভাবে দুর্বল ট্রেড ইউনিয়নের কারণে
মরক্কো আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছিল, বিশেষ করে ফরাসি কোম্পানিগুলো খরচ কমাতে এখানে কল সেন্টার স্থাপন করত।
মরক্কান আউটসোর্সিং সার্ভিস ফেডারেশনের সভাপতি ইউসেফ চরাইবি স্থানীয় দৈনিক ‘লে মাতিন’-কে বলেছেন, ঐতিহাসিকভাবে ফরাসি বাজার থেকেই এই খাতের আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিশুদ্ধ টেলিমার্কেটিং বা ফোনে বিপণন এখন মোট কার্যক্রমের মাত্র ১৫% থেকে ২০% জুড়ে রয়েছে।’ তবে এই খাতটি ইতিমধ্যে ঐতিহ্যবাহী কল সেন্টার সেবার বাইরে অন্যান্য বৈচিত্র্যময় কার্যক্রম শুরু করেছে।
অন্যান্য দেশেও এই ধরনের কড়া নিয়ম চালু রয়েছে। জার্মানিতে ২০০৯ সাল থেকেই অনুরূপ একটি ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। নেদারল্যান্ডস গত মাসে তাদের এই নিয়মগুলো আরও শক্তিশালী করেছে। দেশটি ইতিমধ্যেই অনাকাঙ্ক্ষিত সেলস কল নিষিদ্ধ করেছিল, তবে এখন থেকে কোম্পানিগুলো তাদের নিজস্ব গ্রাহকদেরও পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো প্রমোশনাল অফার বা প্রচারণামূলক ফোন করতে পারবে না।
অনেক দেশই আবার ‘অপ্ট-আউট’ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ ‘ন্যাশনাল ডু নট কল রেজিস্ট্রি’-তে নাম নিবন্ধন করতে পারেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত সেলস কল অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
কানাডার নিজস্ব ‘ডু নট কল লিস্ট’ রয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের রয়েছে ‘টেলিফোন প্রেফারেন্স সার্ভিস’। যুক্তরাজ্যে অপ্ট-আউট তালিকায় থাকা গ্রাহকদের কাছে কোনো কোম্পানি ফোন করলে প্রতি কলের জন্য সর্বোচ্চ ৫ লাখ পাউন্ড (৫৮৩,০০০ ইউরো) পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
ইউরোনিউজ
