মঙ্গলবার, ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ২৪ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘তিন মাস আগেও মা-বাবার সঙ্গে দেশে এসেছিল নাহিল। গ্রামের বাড়িতে ছিল ২৮ দিন। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করেছে, চাচাতো ভাইবোনদের সঙ্গে খেলেছে। ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলত। কে জানত, সেটিই হবে আমাদের সঙ্গে তার শেষ দেখা!’

কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার কাটখাল গ্রামের ফরিদ মিয়ার (৪৫)। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাড়ে তিন বছরের ভাতিজা নাহিলের মুখ। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উত্তর শহরতলিতে একটি ভবনে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছে শিশুটি।

২০১০ সালে ফ্রান্সে পাড়ি জমান কাটখাল গ্রামের জলাই মিয়ার ছেলে রাসেল আহমদ (৩৫)। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করা রাসেল ব্যবসা করেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লিজা হকের (৩০) সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। রাজশাহীর বাসিন্দা লিজার সঙ্গে রাসেলের সংসারে নাহিল ছিল তাঁদের একমাত্র সন্তান।

সাড়ে তিন বছরের নাহিলকে ঘিরেই ছিল বাবা-মায়ের সব স্বপ্ন। ব্যবসার কাজে রাসেল দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকতেন। অন্যদিকে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির কারণে লিজাকেও প্রতিদিন সকালে কর্মস্থলে যেতে হতো। ফলে কর্মজীবী এই দম্পতির একমাত্র সন্তান দিনের অধিকাংশ সময় কাটাত নানির কাছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর সকালেও প্রতিদিনের মতো কাজে যাওয়ার আগে নাহিলকে নানির বাসায় রেখে যান লিজা। স্থানীয় প্রবাসী ও ফরাসি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্যারিসের উত্তর শহরতলির ওভেরবিলিয়ে এলাকার একটি দোতলা ভবনে গ্যাস লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।

নাহিলের নানা-নানির বাসার পাশেই ছিল ভবনটি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি কক্ষে গ্যাস লিকেজ থেকেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত। বিস্ফোরণের পর ভবনের বড় একটি অংশ ধসে পড়ে এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসস্তূপ।

খবর পেয়ে ফরাসি দমকল বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছান। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী কুকুরের সহায়তায় রাতভর চলে উদ্ধার অভিযান। পরে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধার করা হয় ছোট্ট নাহিলের নিথর দেহ।

দুর্ঘটনায় নাহিলের নানা এমদাদুল হক (৬৫), নানি সালমা হক (৫৫) এবং দুই খালা রাহা হক (৩৫) ও ইয়ামা হক (১৮) আহত হয়েছেন। তাঁদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, নাহিলের নানি ও দুই খালার অবস্থা আশঙ্কাজনক।

আজ সোমবার সকালে হবিগঞ্জের কাটখাল গ্রামে নাহিলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বাড়িজুড়ে নীরবতা, স্বজনদের চোখেমুখে বিষাদের ছাপ। প্রতিবেশীরাও এসে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

নাহিলের দাদা-দাদি কেউই আর বেঁচে নেই। গ্রামের বাড়িতে রয়েছেন তাঁর চাচা-চাচি ও চার চাচাতো ভাইবোন।

নাহিলের চাচা ফরিদ মিয়া পুকড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। তিনি জানান, তাঁর ভাই রাসেল মুঠোফোনে বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নাহিলের মরদেহ ফ্রান্সেই দাফন করা হবে। তবে এখনো মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

ফরিদ মিয়া বলেন, ‘ওই রাত থেকে আমরা শুধু নাহিলের খবরের অপেক্ষায় ছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল, হয়তো ওকে জীবিত উদ্ধার করা হবে। কিন্তু পরে যখন জানতে পারলাম, নাহিল আর বেঁচে নেই—তখন আর কিছু বলার মতো ছিল না।’

মাত্র তিন মাস আগে মা-বাবার সঙ্গে দেশে এসে আত্মীয়স্বজন ও চাচাতো ভাইবোনদের সঙ্গে কাটানো সময়টুকুই যে নাহিলের স্বজনদের সঙ্গে শেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে, তা তখন কেউ কল্পনাও করেননি।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version