বৃহস্পতিবার, ৬ই আগস্ট, ২০২৬   |   ২২শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে একের পর এক কর্মী আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনায় সেখানে এক নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে।

গত অক্টোবর থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংশ্লিষ্ট সেবা বিভাগে (এসপিএম) কর্মরত দুজন কর্মীর আত্মহত্যা, দুটি আত্মহত্যার চেষ্টা এবং একটি সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনার পর কর্মক্ষেত্রে বিষাক্ত পরিবেশ ও হয়রানির অভিযোগে ফৌজদারি ‘মানসিক হয়রানি’ তদন্ত শুরু করেছে প্যারিস প্রসিকিউটর অফিস।

এসপিএম মূলত ৫০টি বিভাগ এবং প্রায় ৩,৫০০ কর্মী নিয়ে গঠিত, যারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাথে লিয়াজোঁ বা সমন্বয় রক্ষা করে কাজ করেন। তবে ভুক্তভোগীদের কেউই প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুর অধীনে সরাসরি কাজ করতেন না।

সবশেষ গত এপ্রিলে লরা নামের এক নারী ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবন শেষ করার চেষ্টা করেন, তবে এক যাত্রীর তৎপরতায় তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান।

ফরাসি রেডিও ‘ফ্রান্স ইন্টার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মহত্যার চেষ্টার কয়েক মাস আগেই তিনি নিজের উইল (ইচ্ছাপত্র) তৈরি করেছিলেন এবং নিজের শেষকৃত্যের প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছিলেন।

আত্মহত্যার এই চেষ্টার পর, ওই নারী মানসিক হয়রানি এবং অন্যের জীবন বিপন্ন করার অভিযোগে একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেন, যা কর্মক্ষেত্রের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে একটি বড় তদন্তের পথ উন্মুক্ত করে।

লরার আইনজীবী ক্রিস্টেল মাজার মতে, ৩০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই স্থায়ী সরকারি কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর চিঠিপত্র বিভাগে তাঁর সর্বশেষ পোস্টিংয়ে পেশাগত বিচ্ছিন্নতা এবং চরম অপমানের শিকার হয়েছিলেন।

আইনজীবী ক্রিস্টেল মাজা ফ্রান্স ইন্টারকে বলেন, ‘আমার মক্কেলকে একপ্রকার অদৃশ্য করে দেওয়া হয়েছিল—তাঁকে আর কোনো সভায় আমন্ত্রণ জানানো হতো না, তাকে সাংগঠনিক তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, এক কথায় তিনি সেখানে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। স্কুলে যেভাবে সহপাঠীদের উত্যক্ত বা ওস্ট্রাসাইজড (সমাজচ্যুত) করা হয়, ঠিক সেভাবে তাঁকে নিয়ে বিদ্রুপ ও উপহাস করা হতো।’

প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর অধীনে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়টি যেন এক পরিবর্তনশীল দরজায় পরিণত হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ম্যাখোঁর সিদ্ধান্তের পর গত দুই বছরে চারজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছেন।

এসপিএম-এর কর্মীরা কর্মক্ষেত্রের এই বিষাক্ত পরিবেশের জন্য আংশিকভাবে এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে দায়ী করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সূত্র ফ্রান্স ইন্টারকে বলেন, ‘এখানে প্রতি চার বা ছয় মাস পর পর যেন একটি নতুন সামরিক বাহিনী এসে পৌঁছায়। নতুন চিফ অব স্টাফ এসে তাঁর নিজের মতো করে নতুন সংগঠন সাজাতে চান। টিমগুলো পরিবর্তন হয়, আমরা অফিস পুনর্গঠন করি, টেলিফোন পরিবর্তন করি, নতুন বসের নতুন সব চাহিদা আমাদের পূরণ করতে হয়।’

গত অক্টোবরে আইনি ও প্রশাসনিক তথ্য সেবা বিভাগের এক সরকারি কর্মকর্তা তাঁর কর্মক্ষেত্রেই ছুরি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।

এরপর গত মার্চে বিনিয়োগ সংক্রান্ত জেনারেল সেক্রেটারিয়েটের এক প্রকল্প ব্যবস্থাপক, যাঁর দূরবর্তী বা রিমোটলি কাজ করার কথা ছিল, তিনি নিজের বাড়িতে আত্মহত্যা করেন। ফ্রান্স ইন্টারের দেখা নথিপত্র অনুযায়ী, এই ঘটনার আগে ‘ব্যবস্থাপক পর্যায়ের ব্যর্থতার পটভূমিতে’ ছোট মদের বোতল চুরির অভিযোগ নিয়ে ওই ব্যক্তি তাঁর ম্যানেজারের সাথে তীব্র বিবাদে জড়িয়েছিলেন।

এর মাত্র দুই দিন পর, লরার পরিচিত সরকারের সাধারণ সচিবালয়ের ৫৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ‘কর্মক্ষেত্রের চরম মানসিক যন্ত্রণার’ কারণে ভাল-দ’ওয়াজে একটি ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। বিভাগটিতে কর্মী ছাঁটাই চলছিল এবং তিনি নিয়মিত অসুস্থতার ছুটিতে ছিলেন।

এপ্রিলে লরার আত্মহত্যার চেষ্টার পর, প্যারিসের সরকারি অফিসের টয়লেট থেকে পাবলিক ট্রান্সফরমেশন সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় অধিদপ্তরের এক তরুণ সরকারি কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

আইনজীবী ক্রিস্টেল মাজা বলেন, ‘আমরা এমন আচরণ দেখতে পাচ্ছি যা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এক হিংস্র প্রতিযোগিতা চলছে। মূলত, এগিয়ে যাওয়ার জন্য আপনাকে অন্যের পিঠে পাড়া দিতে হবে। বিশেষ করে এই রাজনৈতিক ও পেশাদার প্রেক্ষাপটে পদগুলো পাওয়ার জন্য সবাই মরিয়া হয়ে থাকে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘সাধারণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য, যারা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে দূরে থেকে কেবল আইনি নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে চান, তাদের জন্য এই পরিবেশ সম্পূর্ণ দিশেহারা পরিস্থিতি তৈরি করে।’

সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রশাসনিক ও আর্থিক সেবা অধিদপ্তর ভুক্তভোগীদের প্রতি তাদের গভীর দুঃখ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

অধিদপ্তরের এক মুখপাত্র অবশ্য উল্লেখ করেছেন যে, লরাকেও আগে অন্যকে হয়রানির দায়ে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং তিনি নিজেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি ছিলেন।

গত অক্টোবরে আত্মহত্যার চেষ্টার বিষয়ে মুখপাত্র জানান, মেডিকেল কমিটি এটিকে কর্মক্ষেত্র-সংক্রান্ত কারণ হিসেবে নাকচ করে দিয়েছে।

পৃথক দুটি বিভাগে সংঘটিত দুটি আত্মহত্যার ঘটনার বিষয়ে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে।

বিবৃতিতে আরও যোগ করা হয়েছে, ‘এটি লক্ষ করা উচিত যে এই ব্যক্তিদের কেউই সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে বা তাঁর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে কাজ করতেন না।’

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version