শনিবার, ১৭ই অক্টোবর, ২০২৬   |   ২রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি এবং জ্বালানি তেলের মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেশজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভের মুখে পড়তে যাচ্ছে ফ্রান্স। শ্রমিক সংগঠন ও বিতর্কিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ কায়েমি আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে এবার বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর যোগ দেওয়ার ঘোষণায় তীব্র সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে দেশটির সরকার।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৫০০টি পৃথক কর্মসূচি এবং ৯০টির মতো বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। রাজধানী প্যারিস, মার্সেইসহ প্রধান প্রধান শহরগুলোতে ব্যাপক সহিংসতার আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ।

শনিবার সকালেই দক্ষিণ ফ্রান্সের মার্সেই শহরে বিক্ষোভকারীরা আবর্জনার পাত্র (ডাস্টবিন) এবং বৈদ্যুতিক স্কুটারে আগুন ধরিয়ে দিলে রায়ট পুলিশ গিয়ে হস্তক্ষেপ করে। ভাঙচুর ও লুটপাটের হাত থেকে রক্ষা পেতে দেশজুড়ে বিভিন্ন এলাকার দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কাঠের তক্তা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর ভিড় এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবনের সংস্কারের দাবিতে গত চার সপ্তাহ ধরেই স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে। বেশিরভাগ ছাত্রবিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু ক্ষেত্রে দাঙ্গাবাজদের সঙ্গে পুলিশের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের আশঙ্কা, উগ্র বামপন্থি দলগুলো পুলিশের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে মহাসড়ক কিংবা জরুরি অবকাঠামো কোনোভাবেই অবরুদ্ধ করতে দেওয়া হবে না বলে কড়া বার্তা দিয়েছে প্রশাসন।

এদিকে শুক্রবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে সবসময় সম্মান করা হয়, তবে তা অবশ্যই মানুষ ও সম্পদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করে হতে হবে। তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

পুলিশি সহিংসতার মুখে তীব্র নজরদারি
বিক্ষোভ দমনে গিয়ে ফরাসি পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশের রবার বুলেটের আঘাতে এক ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্র চোখ হারিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে পুলিশের স্টান গ্রেনেড হাতে তুলে নিতে গিয়ে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরের হাত উড়ে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনার পর বিশেষ কিছু স্টান গ্রেনেড ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানিয়েছেন, শনিবার যদি চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে আবারও স্টান গ্রেনেড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় পুলিশের সহিংসতার অভিযোগে ইতিমধ্যে ৩৬টি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে, যার মধ্যে মারাত্মকভাবে অঙ্গহানি এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালে জ্বালানি তেলের কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া কুখ্যাত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই পুলিশের মামলার প্রস্তুতি
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকোরনু জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৯৩৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও জেন্ডারমে আহত হয়েছেন। পাশাপাশি ২৪৮ জন শিক্ষার্থী এবং ১৪৯ জন শিক্ষক আহত হয়েছেন, যা দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আহতের রেকর্ড।

প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, ছাত্রদের আন্দোলন ধীরে ধীরে ‘নগর সহিংসতার ঢেউয়ে’ রূপ নিচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগে খোদ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই আদালতে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ পুলিশ ইউনিয়ন ‘অ্যালায়েন্স পুলিশ ন্যাশনাল’।

ইউনিয়নটির অভিযোগ, মাঠে থাকা পুলিশ সদস্যদের ‘পরস্পরবিরোধী নির্দেশনা’ দিয়ে সহিংসতার মুখে এবং জনসাধারণের ক্ষোভের মুখে একা ফেলে দেওয়া হচ্ছে। তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্য এবং অভ্যন্তরীণ মৌখিক নির্দেশনার মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে বলে দাবি করেছে।

অন্যদিকে কট্টর বামপন্থি ‘ফ্রান্স আনবোড’ দলটিকে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার জন্য দায়ী করছে সরকার। দলটির নেতা জঁ-লুক মেলেনশন সমর্থকদের পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানালেও পরবর্তীতে তিনি দাবি করেছেন যে তিনি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেরই পক্ষপাতী। সার্বিকভাবে ঝুলে থাকা পার্লামেন্টে কৃচ্ছ্রসাধন বাজেট পাস করার চেষ্টার মাঝেই এই গণআন্দোলন ফরাসি সরকারকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ফেলেছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version