সোমবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬   |   ১১ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈষম্যের প্রতিবাদে শনিবার লাখো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে গত সপ্তাহের মতো বড় ধরনের সহিংসতা এড়ানো গেলেও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় সারা দেশে প্রায় এক হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

পুলিশের হিসাবে, রাজধানী প্যারিসে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলে অংশ নেন। পতাকা হাতে তাঁরা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈষম্যের প্রতিবাদ জানান। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ‘রাষ্ট্র, পুলিশ ও ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।

মিছিল শেষে মুখোশ পরা কয়েকটি ছোট দলের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। তবে গত শনিবারের তুলনায় সহিংসতা অনেক কম ছিল। গত সপ্তাহে প্যারিসে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল।

লিয়ঁ, বোর্দো ও গ্রেনোবলেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। ক্লেরমঁ-ফেরাঁ, লিল ও নিসে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কয়েক দফা কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ।

দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইয়ে কিছু তরুণ রাস্তা বন্ধ করতে বড় ধাতব পাত টেনে আনেন। তাঁরা আবর্জনার পাত্রে আগুন দেন এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশের দিকে পাথর ও বোতল ছোড়েন। রাত নামার পরও সেখানে সংঘর্ষ চলতে থাকে।

বিক্ষোভে ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের দাবি
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর প্রায় দ্বিগুণ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সাংবাদিকদের বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশকে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। উগ্র বামপন্থী কর্মী ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

নুনেজ জানান, সারা দেশে প্রায় এক হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের অনেককে আগাম তল্লাশির পর আটক করা হয়। এসব তল্লাশিতে আতশবাজি, ধাতব বল ও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে—এমন বিভিন্ন সামগ্রী পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভ ঘিরে প্যারিসের বড় একটি অংশ কার্যত অবরুদ্ধ শহরের রূপ নেয়। দোকানিরা তাঁদের দোকানের সামনের অংশ বন্ধ করে দেন, জাদুঘরগুলো বন্ধ রাখা হয় এবং ২০টির বেশি মেট্রো স্টেশনের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

এর আগে গত সপ্তাহে ফ্রান্সজুড়ে হাজার হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এবার দোকান বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছিল ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।
প্যারিসের একটি কিটন বুটিকের ব্যবস্থাপক অস্কার বলেন, ক্রেতা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই দোকান খোলা রাখার কোনো অর্থ হয় না।

ল্যুভর, মুসে দ’অরসে ও প্যারিস অপেরার মতো রাজধানীর কয়েকটি বিখ্যাত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শনিবার বন্ধ রাখা হয়। এতে হতাশা প্রকাশ করেন পর্যটকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স থেকে আসা পর্যটক জাভিয়ের দোলিওল বলেন, চারদিকে দোকানপাট বন্ধ। তাঁরা কোথায় যাবেন, তা বুঝতে পারছেন না।

ইউরোপের অন্য দেশেও ছড়িয়েছে বিক্ষোভ
গত মাসে প্যারিসের উপকণ্ঠে শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের শুরু। শিক্ষকসংকট ও স্কুলের জরাজীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিক্ষোভে রূপ নেয়।

এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। শনিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে কাঁদানে গ্যাস ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে পুলিশ। ইতালির বিভিন্ন শহরেও টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো বিক্ষোভ হয়েছে।
ফ্রান্সের বামপন্থী নেতারা বিভিন্ন শহরে অনুমোদিত মিছিলের সংখ্যা সীমিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। প্যারিসের বিক্ষোভস্থল শেষ মুহূর্তে রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।

প্যারিসের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কট্টর বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ আন্দোলনকারীদের ‘সম্মিলিত শৃঙ্খলা ও আত্মসংযমের অসাধারণ প্রদর্শন’ বলে প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ফ্রান্সের সামাজিক সংকট সমাধানে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ চলবে।

মেলঁশোঁ আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাখোঁকে বুঝতে হবে, এই বিক্ষোভ প্রতি সপ্তাহেই ফিরে আসতে পারে। তবে এখনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ তাঁর সামনে রয়েছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version