বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শিক্ষক, দমকলকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ হাজার হাজার সরকারি কর্মচারী ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। একই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা সংকটের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের পৃথক বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে।
ট্রেড ইউনিয়নগুলোর দাবি, দেশজুড়ে একদিনের এই ধর্মঘটে প্রায় ৩ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজার। বেতন ও কর্মপরিবেশের উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট কাটছাঁটের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ করেন সরকারি কর্মীরা।
এদিকে দেশটির চার শতাধিক স্কুলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি স্কুল পুরোপুরি অবরুদ্ধ ছিল এবং আরও ৪৪টি স্কুলে অবরোধের চেষ্টা করা হয়।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী মিলিয়ে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪৮ সদস্যও। এ ছাড়া বিক্ষোভের ঘটনায় অন্তত ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে।
সরকারের খসড়া বাজেট পেশের দুই দিন আগে এবং আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সাত মাস আগে এই ধর্মঘট ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হলো। ইউনিয়নগুলোর দাবি, ২০২৭ সালে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন না বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সরকার। এতে প্রায় ২ বিলিয়ন ইউরো সাশ্রয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউনিয়নগুলোর দাবি, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে টানা চতুর্থ বছর সরকারি কর্মচারীদের বেতন স্থবির থাকবে। তাদের হিসাবে, দীর্ঘদিনের বেতন স্থবিরতার কারণে কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা দুই অঙ্কের হারে কমেছে। তাই তারা ৬ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।
জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবারের সাধারণ সম্পাদক সোফি বিনেট এই ধর্মঘটকে ‘রেড অ্যালার্ট’ বা চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এই ক্ষোভ সহজে থামবে না। সরকারকে বাজেটের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতেই হবে।’ প্রস্তাবিত ব্যয় সংকোচন পরিকল্পনা প্রত্যাহারের জন্য সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমাও বেঁধে দেন তিনি।
ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১১ শতাংশের কিছু বেশি শিক্ষক ও স্কুলকর্মী ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ফরাসি শিক্ষকেরা গড়ে কম বেতন পান।
অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে প্রতি ১০ জনে একজনেরও কম ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন। হাসপাতালগুলোতে উপস্থিতির হার ছিল আরও কম। একদিনের বেতন কেটে নেওয়ার আশঙ্কা কর্মীদের উপস্থিতি কম হওয়ার একটি কারণ হতে পারে। এদিকে কয়েকটি বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছিল ফ্রান্সের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
বিক্ষোভে অংশ নেন পেশাদার দমকলকর্মীরাও। তাদের দাবি, চলতি গ্রীষ্মের ভয়াবহ দাবানলে দমকল বাহিনীর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এদিকে শিক্ষার্থীরা রুটিন জটিলতা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট এবং চলতি বছরের তাপপ্রবাহে শ্রেণিকক্ষ অতিরিক্ত গরম হয়ে পড়ার মতো সমস্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছে। রাজধানী প্যারিসের পার্শ্ববর্তী ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরে দেশের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিক্ষোভে ১০ জন শিক্ষার্থী ও কর্মচারী আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪৮ সদস্যও। কোনো কোনো এলাকায় শিক্ষার্থীরা ময়লার পাত্রে আগুন দেয় এবং পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছোড়ে। জবাবে পুলিশ লাঠিপেটা ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বিএফএমটিভিকে বলেন, ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এখনও চূড়ান্ত হিসাব নেই। তবে আমাকে জানানো হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। সহিংসতা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো কিছুই সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেয় না।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘর্ষের নিন্দা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এদোয়ার্দ জেফ্রে। তিনি লিখেছেন, ‘এই সহিংসতা অবর্ণনীয়।’
আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এসব কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া কিংবা অবরোধ বাড়ানোর আহ্বান জানানো আমাদের শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মচারী উভয়কেই বিপদের মধ্যে ফেলার শামিল। এটি দায়িত্বজ্ঞানহীন।’
প্যারিসের নিম্নআয়ের শহরতলি সেন-সাঁ-দেনিতে বামপন্থি দল ‘ফ্রান্স আনবোড’-এর সদস্য ও জেলা মেয়র বালি বাগায়োকো বিক্ষোভকারী শত শত শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জাতীয় সংগীত গেয়ে বিক্ষোভকে ‘সম্পূর্ণ বৈধ’ বলে উল্লেখ করেন। ধনী এলাকার তুলনায় দরিদ্র এলাকাগুলো কম সরকারি বরাদ্দ পায় বলেও দাবি করেন তিনি।
প্যারিসের আরাগো স্কুলের বাইরে শিক্ষার্থীরা ‘মাখোঁ বিস্ফোরণ’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে ময়লার পাত্রের ওপর বসে স্কুলের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়। তাদের অনেকের মুখ ঢাকা ছিল। এলেন-বুশে স্কুলের বাইরে একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘কম পুলিশ, বেশি অর্থ’।
সেখানকার চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী মায়েল ব্রেটন বলেন, ‘আমরা পুলিশের উপস্থিতি কম চাই। কারণ আমরা মনে করি, হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং সাধারণভাবে সামাজিক আন্দোলনগুলোর ওপর পুলিশ ব্যাপক দমনপীড়ন চালায়। এটি একটি বড় সমস্যা, বিশেষ করে যখন আমাদের স্কুলে এবং সামগ্রিকভাবে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় তহবিলের এমন প্রকট সংকট রয়েছে।’
সোমবার প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকোরনু হাইস্কুলের বিক্ষোভকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে সমালোচনা করলেও স্বীকার করেন, ‘হাইস্কুলগুলোর সমস্যাগুলো অবশ্যই শুনতে হবে এবং সমাধান করতে হবে।’
প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় বামপন্থি রাজনীতিক জঁ-লুক মেলেনশন সরকারের বিরুদ্ধে সরকারি সেবা খাতকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেওয়ার অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটের বিরুদ্ধে সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
