আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে ফ্রান্সকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বাধিক পরিদর্শিত পর্যটন গন্তব্য হতে যাচ্ছে স্পেন। সে সময় দেশটিতে বার্ষিক আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটিতে (১১০ মিলিয়ন) পৌঁছাবে। বৈশ্বিক পর্যটনের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিচালিত ‘ডেলয়েট’ এবং ‘গুগল’-এর এক যৌথ গবেষণায় এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় আগামী ১৪ বছরের মধ্যে স্পেন তার উত্তরের প্রতিবেশী ফ্রান্সকে ছাড়িয়ে যাবে।
বর্তমানে ফ্রান্স বিশ্বের শীর্ষ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালে রেকর্ড ১০ কোটি ২০ লাখ (১০২ মিলিয়ন) আন্তর্জাতিক পর্যটককে স্বাগত জানিয়েছে দেশটি। তবে স্পেনও খুব পিছিয়ে নেই; একই সময়ে তারা ৯ কোটি ৬৮ লাখ (৯৬.৮ মিলিয়ন) বিদেশি পর্যটককে গ্রহণ করেছে, যা ২০২৪ সালের ৯ কোটি ৪০ লাখের তুলনায় ৩.২ শতাংশ বেশি।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে স্পেনে বার্ষিক আন্তর্জাতিক পর্যটকের আগমন ১১ কোটিতে পৌঁছাবে, যার বিপরীতে ফ্রান্সে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ১০ কোটি ৫০ লাখে।
ডেলয়েট এবং গুগলের এই যৌথ গবেষণায় আগামী কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক পর্যটনের বিকাশ কীভাবে হবে এবং জনসংখ্যাগত, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ২০৪০ সাল পর্যন্ত ভ্রমণের ধরণকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে—তা খতিয়ে দেখা হয়েছে।
করোনা মহামারির আগে বৈশ্বিক পর্যটন দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটিতে পৌঁছেছিল। গবেষণায় আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদী এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সংখ্যা প্রায় ২৪০ কোটিতে উন্নীত হবে।
ভৌগোলিক দিক থেকে ইউরোপ পর্যটকদের জন্য বৃহত্তম গন্তব্য হিসেবে তার অবস্থান ধরে রাখবে। ২০১৯ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে এই মহাদেশে অতিরিক্ত ৩৬ কোটি ২০ লাখেরও বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক যুক্ত হবেন, যা বৈশ্বিক পর্যটক বৃদ্ধির ৩৮ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল, যেখানে একই সময়ে অতিরিক্ত ২৭ কোটি ৮০ লাখের বেশি পর্যটক যুক্ত হবেন।
একই সময়ে পর্যটন বাজারটি কেবল ঐতিহ্যগতভাবে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি আরও বিকেন্দ্রীকৃত হবে। ২০৪০ সালেও স্পেন, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি মোস্ট-ভিজিটেড দেশের তালিকায় থাকবে। মেক্সিকো তালিকায় পঞ্চম স্থানে উঠে আসবে এবং ইতালি নেমে যাবে ষষ্ঠ স্থানে। এছাড়া সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি পর্যটন দেশের তালিকায় প্রবেশ করতে পারে।
ফ্রান্সের তুলনায় স্পেনে আয় অনেক বেশি
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১০ কোটি ২০ লাখ পর্যটক নিয়ে ফ্রান্স প্রথম স্থানে থাকলেও তারা আয় করেছে ৭ হাজার ৭৫০ কোটি (৭৭.৫ বিলিয়ন) ইউরো। বিপরীতে, ফ্রান্সের চেয়ে কম (৯ কোটি ৬৮ লাখ) পর্যটক পেলেও স্পেনে বিদেশি পর্যটকদের ব্যয়ের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি।
স্পেনের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে বিদেশি পর্যটকদের মাধ্যমে আয় ৬.৮ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১৩ হাজার ৪৭০ কোটি (১৩৪.৭ বিলিয়ন) ইউরোতে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ১২ হাজার ৬০০ কোটি ইউরো। এই পরিসংখ্যান স্পেনের অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক পর্যটনের বিশাল গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলে।
বর্তমানে স্পেন কেবল পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে পর্যটন ব্যবস্থাকে সুষমভাবে বিতরণের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। দেশটির পর্যটন মন্ত্রী জর্ডি হেরেউ একে ‘শান্তিপূর্ণ প্রবৃদ্ধি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর অধীনে কেবল গ্রীষ্মকালীন পিক-সিজন বা নির্দিষ্ট কিছু পপুলার স্পটের ওপর চাপ না বাড়িয়ে সারা বছর ধরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, গ্যাস্ট্রোনমি (খাবার সংস্কৃতি), প্রকৃতি ও ঐতিহাসিক শহরগুলোতে পর্যটন ছড়িয়ে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
দাবদাহ ও অতিরিক্ত পর্যটনের তীব্র চাপ
বিশ্বের এক নম্বর পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হওয়ার এই পূর্বাভাস স্পেনের জন্য একই সঙ্গে এক বড় চ্যালেঞ্জও বটে। কারণ ইতিমধ্যেই দেশটিতে ‘অতিরিক্ত পর্যটন’ বা ‘ওভার-ট্যুরিজম’-এর সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্সেলোনা, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ এবং ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জের মতো জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দারা অতিরিক্ত পর্যটনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ করেছেন।
বাসিন্দাদের অভিযোগ—বিপুল পরিমাণ পর্যটকের ঢল এবং পর্যটকদের জন্য ব্যবহৃত ভাড়ার অ্যাপার্টমেন্টের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য আবাসন সংকট ও বাসা ভাড়া আকাশচুম্বী হচ্ছে। সেই সঙ্গে গণপরিবহন, জনসেবা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরও প্রচণ্ড চাপ পড়ছে।
এই চাপ সামলাতে স্পেন সরকার এবং স্থানীয় পৌরসভাগুলো বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে:
টুরিস্ট ফ্ল্যাট বাতিল: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্পেন সরকার আবাসন সংকট মেটাতে নিয়ম না মানা ৫৩,০০০ টুরিস্ট ফ্ল্যাটের লাইসেন্স বাতিল করে সেগুলো সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া বার্সেলোনা ২০২৮ সালের মধ্যে শহরের সব ধরনের (প্রায় ১০,০০০) টুরিস্ট ফ্ল্যাটের লাইসেন্স বাতিল করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ক্রুজ শিপের ওপর কড়াকড়ি: বার্সেলোনায় বড় বড় বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজের যাতায়াত প্রতিদিন ১০টি থেকে কমিয়ে ৭টিতে আনা হয়েছে।
পর্যটকদের আচরণের ওপর নজরদারি: মালাগা ও ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জে অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন, উচ্চস্বরে গান বাজানো এবং অসভ্য আচরণের বিরুদ্ধে বিশেষ সচেতনতামূলক প্রচারণা ও কঠোর আইন করা হয়েছে।
ডেলয়েট এবং গুগলের এই পূর্বাভাস মূলত স্পেনের সামনে এক বড় দ্বিধা তৈরি করেছে। একদিকে নতুন ১৩ মিলিয়ন অতিরিক্ত পর্যটক দেশের অর্থনীতিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো আয় ও কর্মসংস্থান বাড়াবে, অন্যদিকে তা স্থানীয় আবাসন, গণপরিবহন, সমুদ্রসৈকত ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সংকট আরও বাড়াবে।
স্পেনের আসল চ্যালেঞ্জ এখন কেবল এক নম্বরে পৌঁছানো নয়, বরং এই ১১ কোটি বিদেশি পর্যটককে এমনভাবে সামলানো যাতে তাদের আগমন স্পেনের পরিবেশ, স্থানীয় অর্থনীতি ও বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ক্ষতি না করে দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনতে পারে।
