ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন অভিন্ন অভিবাসন ও আশ্রয়নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে নিজেদের জাতীয় আইন সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জার্মানি। এ বিষয়ে দেশটির জোট সরকারের দুই শরিক দল, রক্ষণশীল সিডিইউ/সিএসইউ ও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এসপিডি), একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে।
সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে জার্মান বার্তা সংস্থা-ডিপিএ।
নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, কারা আশ্রয় আবেদন করতে পারবেন, সে বিষয়ে আরও কঠোর মানদণ্ড আরোপ করা হবে।আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকা ব্যক্তিদের জন্য কাজের অনুমতি দ্রুত দেওয়া হবে এবং যাদের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাদের ক্ষেত্রে আটক ও দ্রুত প্রত্যাবাসনের পথ সহজ করা হবে।
জার্মানির বর্তমান জোট সরকারে রয়েছেন চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস, যার নেতৃত্বে রয়েছে সিডিইউ/সিএসইউ জোট। সিডিইউ-এর অভ্যন্তরীণ নীতিবিষয়ক মুখপাত্র আলেকজান্ডার ঠ্রোম জানান, ইউরোপীয় আইন অনুযায়ী গত বছর জার্মানিতে আসা মোট আশ্রয়প্রার্থীদের প্রায় অর্ধেকেরই অন্য কোনো ইইউ সদস্য রাষ্ট্রে থাকার কথা ছিল।
তিনি এখানে ডাবলিন নীতিমালার কথা উল্লেখ করেন। এই নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো আশ্রয়প্রার্থী ইউরোপের যে দেশে প্রথম প্রবেশ করেন, সেই দেশেই তার আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ইতালি বা গ্রিসের উপকূলে প্রবেশ করা বহু অভিবাসী পরে জার্মানিতে এসে আশ্রয় আবেদন করেন, যাকে বলা হয় ‘সেকেন্ডারি মাইগ্রেশন’।
এই সমস্যা মোকাবিলায় জার্মানি চালু করতে যাচ্ছে সেকেন্ডারি মাইগ্রেশন সেন্টার। ঠ্রোম বলেন, যেসব আশ্রয়প্রার্থী প্রথম যে দেশে প্রবেশ করেছিলেন, সেখানে ফেরত পাঠানোর আগে তাদের এসব কেন্দ্রে রাখা হবে। এ ছাড়া আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অবাধ যাতায়াতের সুযোগ সীমিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নতুন সংস্কারের অংশ হিসেবে, পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলে আশ্রয়প্রার্থীদের আটক রাখার আইনি সুযোগ তৈরি করা হবে। এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য হবে যেসব ক্ষেত্রে প্রত্যাবাসন কার্যকর করা সম্ভব, এই বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর অবস্থানে ছিল সিডিইউ/সিএসইউ। তবে অভিবাসন প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে নমনীয় অবস্থান নেওয়া এসপিডির সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাড়ও থাকছে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডেয়ার স্পিগেল জানায়, এখন থেকে আশ্রয় আবেদন জমা দেওয়ার মাত্র তিন মাস পরই কাজ করার অনুমতি দেওয়া হবে, বর্তমানে এই সময়সীমা ছিল ছয় মাস।
সরকারের মতে, এতে করে আশ্রয়প্রার্থীরা দ্রুত শ্রমবাজারে যুক্ত হতে পারবেন এবং সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমবে। নতুন সমঝোতায় শরণার্থী শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা ও কল্যাণমূলক সুবিধা উন্নত করার সিদ্ধান্তও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দীর্ঘ আলোচনা ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতবিরোধের পর ২০২৪ সালে ইইউ একটি অভিন্ন অভিবাসন ও আশ্রয়নীতিতে সম্মত হয়।
এই নতুন নীতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে ইইউর ২৭টি সদস্য দেশে এটি কার্যকর হবে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজ নিজ জাতীয় আইনে এই বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্যতামূলকভাবে জুনের মধ্যেই আইন সংশোধন করতে হবে।
নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় অনুমোদনের হার ২০ শতাংশের কম, তাদের আবেদন ইইউর বাইরের সীমান্তেই প্রাথমিকভাবে যাচাই করা হবে, আবেদন অগ্রহণযোগ্য হলে সেখান থেকেই সরাসরি নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানির এই সংস্কার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে, দেশটি একদিকে নিয়ন্ত্রিত ও কঠোর অভিবাসন ব্যবস্থা চায়। অন্যদিকে যারা আইন মেনে আশ্রয় প্রক্রিয়ায় থাকবেন, তাদের দ্রুত কাজ ও একীভূত হওয়ার সুযোগ দিতেও আগ্রহী।
এটি শুধু জার্মানির নয়, বরং পুরো ইউরোপজুড়েই অভিবাসন নীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
