বুধবার, ২৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ১৩ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইউরোপের শক্তিশালী অর্থনীতি জার্মানি দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র শ্রমিক সংকটে ভুগছে। জনসংখ্যার দ্রুত বার্ধক্য, দক্ষ কর্মীর ঘাটতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাতে চাহিদা বৃদ্ধির ফলে দেশটির বিভিন্ন খাতে লক্ষাধিক শূন্যপদ সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দ্রুত শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্ত করতে নতুন নীতিগত ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়েছে বার্লিন। সরকারের লক্ষ্য, যোগ্য বিদেশি নাগরিকদের জার্মানিতে আসা, বসবাস এবং কর্মসংস্থানের পথ সহজ ও দ্রুত করা।

চ্যান্সেলর ওলাফ শোলৎজ -এর নেতৃত্বাধীন সরকার সংশোধিত ‘স্কিলড ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট’ কার্যকর করার মাধ্যমে দক্ষ কর্মী আনার প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন এনেছে। নতুন আইনে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি ছাড়াও স্বীকৃত কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশ থেকেও দক্ষ কর্মীরা আগের তুলনায় সহজে জার্মানিতে কাজের অনুমতি পাচ্ছেন। পাশাপাশি “সুযোগ কার্ড” চালুর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পয়েন্ট অর্জনকারী প্রার্থীরা চাকরি খোঁজার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জার্মানিতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। ভাষাজ্ঞান, পেশাগত অভিজ্ঞতা, বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়।

স্বাস্থ্যসেবা, নার্সিং, আইটি, প্রকৌশল, নির্মাণ, পরিবহন ও আতিথেয়তা খাতে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জনবল সংকট দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে হাসপাতাল ও বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে নার্স ও কেয়ারগিভারের ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। শিল্প ও উৎপাদন খাতে দক্ষ টেকনিশিয়ান এবং আইটি খাতে সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞের চাহিদাও ক্রমবর্ধমান। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে দ্রুত ও নমনীয় অভিবাসন নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। তাদের মতে, প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়া বিদেশি কর্মীদের নিরুৎসাহিত করছিল।

সরকার শুধু ভিসা সহজীকরণেই থেমে নেই; ডিগ্রি ও পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি প্রক্রিয়াও দ্রুততর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অতীতে বিদেশি সনদ স্বীকৃতি পেতে অনেক সময় লাগত, যা এখন ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ভাষা প্রশিক্ষণ ও ইন্টিগ্রেশন কোর্স সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যাতে নতুন আগতরা দ্রুত জার্মান সমাজ ও কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। বিভিন্ন প্রদেশে জব সেন্টার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে “ফাস্ট-ট্র্যাক” নিয়োগ ব্যবস্থাও চালু হয়েছে।

তবে এই উদ্যোগ রাজনৈতিক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। কিছু বিরোধী দল আশ্রয়প্রার্থীদের দ্রুত শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী এক দশকে অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়বে; ফলে বিদেশি কর্মী ছাড়া জার্মানির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানির এই নীতিগত পরিবর্তন শুধু তাৎক্ষণিক শ্রমিক সংকট মোকাবিলার কৌশল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অংশ। দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা সমাজে সহজে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন, করদাতা হিসেবে অবদান রাখবেন এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনবেন। সঠিক বাস্তবায়ন ও কার্যকর প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ জার্মান অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version