রবিবার, ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ৩রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জার্মানির অভিবাসন ও নাগরিকত্ব ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের প্রতারণা চক্রের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দেশটির নুরেমবার্গ শহরে পরিচালিত এক অভিযানে ভাষা ও নাগরিকত্ব পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগে ৩৯ বছর বয়সী এক ইরাকি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, অভিবাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক জার্মান ভাষা পরীক্ষা ও নাগরিকত্ব পরীক্ষায় প্রকৃত পরীক্ষার্থীর বদলে অন্যদের বসিয়ে পাস করিয়ে দেওয়ার একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন তিনি। এর বিনিময়ে প্রতি প্রার্থী থেকে প্রায় ৬ হাজার ইউরো পর্যন্ত অর্থ নেওয়া হতো।

মিডল ফ্রাঙ্কোনিয়া পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন এবং জার্মান ভাষায় দক্ষ ব্যক্তিদের ভাড়া করে এনে পরীক্ষায় বসাতেন। পদ্ধতিটি ছিল কয়েক ধাপে সংগঠিত, প্রকৃত অভিবাসীর তথ্য সংগ্রহ, তার পরিচয়ে ভুয়া পরীক্ষার্থী হাজির করা, জাল পরিচয়পত্র ব্যবহার ও পরীক্ষায় পাসের সার্টিফিকেট সংগ্রহ। এই সার্টিফিকেট পরে আবাসিক অনুমতি বা নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হতো।

তদন্তকারীরা বলছেন, পরীক্ষার সনদে ছবি না থাকায় জালিয়াতি ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। পরীক্ষার ফলাফল সাধারণত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ডিজিটালভাবে পাঠানো হয়, ফলে যাচাই প্রক্রিয়ায় ফাঁক তৈরি হচ্ছিল।

বাভারিয়ার তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত একাধিক সন্দেহভাজন শনাক্ত করা হয়েছে। মূল অভিযুক্ত ইরাকি নাগরিক, ২২ বছর বয়সী এক জার্মানীর হয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়।এরআগে গত ডিসেম্বরে নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যের একটি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্রে ১০ জন শনাক্ত হয়। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, জার্মানির বিভিন্ন শহরে এই নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল এবং শতাধিক অভিবাসী এতে যুক্ত থাকতে পারে।

জার্মানিতে দীর্ঘমেয়াদি বসবাস বা নাগরিকত্বের জন্য সাধারণত দুটি শর্ত পূরণ করতে হয়্।জার্মান ভাষা দক্ষতা (সাধারণত বি১ স্তর) ও দেশটির সমাজ, আইন ও ইতিহাস সম্পর্কিত নাগরিকত্ব পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় পাস না করলে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে অনেক অভিবাসী দ্রুত বৈধতা পেতে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে বলে মনে করছে পুলিশ।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি শুধু পরীক্ষায় প্রক্সি বসানোর ঘটনা নয়, এর সঙ্গে জাল পরিচয়পত্র তৈরির মতো অপরাধও জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে মানবপাচারকারী নেটওয়ার্ক অভিবাসীদের বৈধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এমন প্রতারণায় জড়ায়। ২০২৪ সালেও জার্মানিতে শত শত ভাষা কোর্সের ভুয়া সার্টিফিকেট তৈরির ঘটনা সামনে আসে। একই বছর ভুয়া পিতৃত্ব দাবি ঠেকাতে আইন প্রস্তাবও আনা হয়েছিল।

পুলিশ বলছে, এ ধরনের জালিয়াতি নতুন মাত্রার নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সনদই নাগরিকত্বের মূল প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তদন্তকারীরা এখন ডিজিটাল যাচাই, বায়োমেট্রিক ছবি সংযুক্তি এবং পরীক্ষার নতুন পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করেছেন।

এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, ইউরোপে অভিবাসন কঠোর হলেও, সেটিকে ঘিরে সমান্তরাল এক ‘প্রতারণা অর্থনীতি’ তৈরি হয়েছে। ভাষা ও নাগরিকত্ব পরীক্ষার মতো মৌলিক প্রক্রিয়াও এখন অপরাধচক্রের টার্গেটে পরিণত হয়েছে।

জার্মান কর্তৃপক্ষ মনে করছে, দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন না আনলে ভবিষ্যতে এ ধরনের জালিয়াতি আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version