বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইতালিতে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট মামলায় দণ্ডিত এক বাংলাদেশি যুবককে দেশটি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বহিষ্কৃত যুবকের নাম ফয়সাল রহমান (২৫)। তিনি সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার দায়ে দুই বছর আট মাসের কারাদণ্ড ভোগ করেন। আদালত রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাজা শেষ হলেও ফয়সাল রহমানের আদর্শিক অবস্থান ও আচরণে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাকে ইতালিতে অবস্থান করতে দেওয়া হলে তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জনসাধারণের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তদন্ত ও অভিযোগের বিবরণ

ইতালির নিরাপত্তা সংস্থা ও প্রসিকিউশনের তথ্যমতে, ফয়সাল রহমান পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর উগ্রবাদী মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তিনি অনলাইনে সক্রিয়ভাবে উগ্রবাদী কনটেন্ট ছড়াতেন এবং সহিংস হামলার পক্ষে প্রচারণা চালাতেন বলে অভিযোগ আনা হয়।

তদন্তে আরও উঠে আসে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তিনি নিজেকে ‘ঈশ্বরের সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া, সশস্ত্র সহিংসতার পক্ষে মতাদর্শমূলক বার্তা প্রচার করা, একে-৪৭ রাইফেল চালনার ম্যানুয়াল সংগ্রহ করে নিজ উদ্যোগে সামরিক প্রশিক্ষণের প্রস্তুতি নেওয়া এবং উগ্রবাদী ভিডিও ও সাহিত্য নিয়মিত অনুসরণ করতেন। এই সব তথ্য ডিজিটাল ফরেনসিক ও অনলাইন নজরদারির মাধ্যমে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

খলিল উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ

মামলার নথি অনুযায়ী, ফয়সাল রহমান উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত হন খলিল উল্লাহ নামের আরেক বাংলাদেশি নাগরিকের সংস্পর্শে এসে। ৩৭ বছর বয়সী খলিল উল্লাহকে ইতালির ব্রেসিয়া শহর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীরা জানান, খলিল উল্লাহ নিয়মিত ফয়সালকে উগ্রবাদী ভিডিও, অডিও বার্তা ও ডিজিটাল বই পাঠাতেন।এছাড়া সহিংস জঙ্গিবাদী আদর্শে তাকে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে চিন্তাগত প্রভাব বিস্তার ঘটান। এই যোগাযোগকেই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আদালত বিবেচনায় নেয়।

কর্মজীবন ও গ্রেপ্তার

ফয়সাল রহমান ইতালির জেনোয়ার ফিনকান্তিয়েরি শিপইয়ার্ডে কর্মরত ছিলেন। তদন্ত সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত পেশাগত জীবনের আড়ালে তিনি উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন। গোপন নজরদারি, অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার সম্পৃক্ততা শনাক্ত হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত ধারায় বিচার শেষে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ

রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে, অভিযুক্ত ব্যক্তি সাজা ভোগ করলেও তার আচরণ ও বিশ্বাসগত অবস্থান সমাজে পুনরায় সহিংস উগ্রবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে তাকে ইতালিতে অবস্থান করতে দেওয়া জননিরাপত্তার পরিপন্থী। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আদালত ফয়সাল রহমানের বিরুদ্ধে স্থায়ী বহিষ্কার জারি করে।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ মোকাবিলায় কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। সাজা শেষে পুনরায় উগ্রবাদে জড়ানোর ঝুঁকি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিবাসন সুবিধা বাতিল ও দেশত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনাটি ইউরোপে বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা, সন্ত্রাসবাদ বা সহিংস উগ্রবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কোনো ছাড় দেবে না।

শেষ কথা

ফয়সাল রহমানের স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কেবল একটি বিচারিক রায় নয়,  বরং এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের একটি দৃঢ় প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি প্রবাসী কমিউনিটির জন্যও একটি সতর্কবার্তা, ব্যক্তিগত অপরাধের দায় শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর সমাজ ও দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রভাবিত করে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version