বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সাদা ভিলা, নীল সমুদ্র আর বিলাসবহুল জীবনধারার প্রতীক ইতালির ক্যাপ্রি দ্বীপ, যে জায়গাটি একসময় ছিল ইউরোপীয় অভিজাতদের নিভৃত অবকাশকেন্দ্র, সেটিই এখন নিজের জনপ্রিয়তার ভারে নুয়ে পড়ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের চাপ সামাল দিতে গিয়ে দ্বীপটির সংকীর্ণ রাস্তা, ঐতিহাসিক এলাকা ও স্থানীয় জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে ক্রমেই অস্থির। এই বাস্তবতায় আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুম থেকে ৪০ জনের বেশি সদস্যের পর্যটক দল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্যাপ্রি কর্তৃপক্ষ।

ক্যাপ্রিতে স্থায়ী বাসিন্দা মাত্র প্রায় ১৩ হাজার। অথচ গ্রীষ্মের ব্যস্ত দিনে সেখানে ৫০ হাজারের কাছাকাছি পর্যটক ও দিনভ্রমণকারী উপস্থিত থাকেন। অর্থাৎ, একেকটি দিনে স্থানীয় জনসংখ্যার প্রায় চার গুণ মানুষের চাপ নিতে হয় দ্বীপটিকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অসম ভারসাম্যই তৈরি করছে তথাকথিত ‘ওভারট্যুরিজম’, যেখানে পর্যটনের আর্থিক সুফল থাকলেও সামাজিক, পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে।

বড় পর্যটক দল সাধারণত, সরু রাস্তা ও দর্শনীয় স্থানে দীর্ঘ সময় ধরে জট তৈরি করে, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল ব্যাহত করে, শব্দদূষণ ও বিশৃঙ্খলা বাড়ায় এবং একই সময়ে সীমিত জায়গায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, এই কারণেই ক্যাপ্রি কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বড় দল ভেঙে ছোট আকারে চলাচল করালে ভিড় তুলনামূলকভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, লাউড স্পিকার নিষিদ্ধ করে ওয়্যারলেস হেডসেট বাধ্যতামূলক করা শুধু শব্দদূষণ কমানোর উদ্যোগ নয়; বরং এটি পর্যটনের ধরন বদলের একটি ইঙ্গিত। একইভাবে ছাতা বা বড় রঙিন চিহ্নের বদলে ছোট, নান্দনিক সাইনবোর্ড ব্যবহারের নির্দেশনা দ্বীপটির সৌন্দর্য ও নান্দনিক পরিবেশ রক্ষার প্রচেষ্টার অংশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বড় চিহ্ন ও উচ্চ শব্দ ক্যাপ্রিকে ‘খোলা জাদুঘর’ বা ‘চলমান সার্কাসে’ পরিণত করছিল।

ক্যাপ্রির সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন ভেনিসের পথ অনুসরণ হিসেবে। ভেনিসে ২০২৪ সালে পর্যটক দলের সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় ২৫ জনে। পাশাপাশি সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে ডে-ট্রিপ ট্যাক্স চালু করা হয়। এই উদ্যোগগুলোর লক্ষ্য ছিল একটাই, পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই করা। ক্যাপ্রির ক্ষেত্রেও একই দর্শন কাজ করছে: পর্যটন থাকবে, তবে শর্তসাপেক্ষে।

সাধারণত পর্যটন নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীরা আপত্তি জানান। কিন্তু ক্যাপ্রিতে ব্যবসায়ী সংগঠন অ্যাসকম কনফকমার্চিও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি লোরেঞ্জো কপোলার ভাষায়, এটি জনপ্রিয় এলাকাগুলোর ভিড় কমাতে একটি ‘অত্যাবশ্যকীয় হাতিয়ার’, যা পথচারীদের জায়গা ফিরিয়ে দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসায়ীদের এই সমর্থন প্রমাণ করে যে অতিরিক্ত পর্যটক শেষ পর্যন্ত ব্যবসার জন্যও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে, কারণ এতে অভিজ্ঞতার মান কমে যায়।

ক্যাপ্রি একা নয়। ইউরোপজুড়ে জনপ্রিয় শহর ও দ্বীপগুলো এখন পর্যটন নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটছে, বার্সেলোনায় পর্যটন অ্যাপার্টমেন্ট সীমিত, আমস্টারডামে ‘স্টে অ্যাওয়ে’ ক্যাম্পেইন ও গ্রিসের সান্তোরিনিতে ক্রুজ যাত্রীর কোটা নির্ধারণ, সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্য এক, পর্যটন যেন স্থানীয় জীবনের শত্রু না হয়ে ওঠে।

ক্যাপ্রির নতুন নিয়ম কার্যকর হলে পর্যটকের সংখ্যা হয়তো কমবে না, কিন্তু পর্যটনের গতি, আকার ও আচরণ বদলাবে। এতে দ্বীপটি আরও বসবাসযোগ্য হবে কি না, তা নির্ভর করবে কঠোর প্রয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ক্যাপ্রি এখন বুঝে গেছে, সীমাহীন জনপ্রিয়তা কোনো আশীর্বাদ নয়। টিকে থাকতে হলে পর্যটনের লাগাম ধরতেই হবে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version