ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে নিরাপদ কোনো তৃতীয় দেশে আলবেনিয়া মডেলে নতুন অভিবাসী ফেরত কেন্দ্র (রিটার্ন সেন্টার) গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে ইতালি। এই তালিকার অন্যতম প্রধান বিকল্প হিসেবে রয়েছে উগান্ডা। তবে অভিবাসী ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্পেনের সাথে ইতালির নতুন কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে।
ইইউ ভূখণ্ডে অবৈধভাবে প্রবেশ করা বিদেশি নাগরিকদের আশ্রয় ও অভিবাসন সংক্রান্ত নথিপত্র পরীক্ষা করার সময় তাঁদের সাময়িকভাবে নিরাপদ তৃতীয় দেশে রাখার জন্য নির্বাসন কেন্দ্র বা ‘এক্সপালশন হাব’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে ইতালি। এর মাধ্যমে মূলত আলবেনিয়া মডেলে গঠিত অভিবাসী কেন্দ্রের পরিধিকে ইউরোপীয় স্তরে নিয়ে যেতে চায় দেশটি।
ইতালির শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত এবং সরকারি কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করা এই প্রস্তাবটি আগামী মঙ্গলবার ইইউর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি কাউন্সিলে পেশ করবেন ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেডোসি।
মরক্কো সীমান্তে অবস্থিত স্পেনের ছিটমহল সেউতায় সম্প্রতি উদ্ভূত অভিবাসন সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে এই জরুরি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। গত কয়েক দিনে সেউতায় অন্তত ৭০ হাজার অভিবাসী জোরপূর্বক স্প্যানিশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছেন।
অভিবাসী কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য সম্ভাব্য আয়োজক দেশের তালিকায় আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ রয়েছে, যার মধ্যে উগান্ডাকে অন্যতম কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় তহবিলের বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত রয়েছে।
আগামী মঙ্গলবারের বৈঠকের আগে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের অভিবাসন নিয়ে একটি অভিন্ন কৌশল তৈরি করতে হবে। ইতালীয় সরকার ডেনমার্কের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সরকারের সাথে যৌথভাবে এই বৈঠকের অনুরোধ করেছে, যাতে ইইউতে অভিবাসন ও আশ্রয় সংক্রান্ত চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা যায়। অন্য কথায়, অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটি সক্রিয় করা যায়।’
তাজানি আরও বলেন, ‘আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে’ এবং ‘সাধারণভাবে অভিবাসীদের মূল দেশ ও ট্রানজিট দেশগুলোতে আলবেনিয়া মডেলের নতুন কেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।’
সেউতার এই নতুন সংকট মূলত অভিবাসী ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইতালি এবং স্পেনের মধ্যে নতুন দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের অবস্থানকে ‘কঠোর এবং মধ্যপন্থী’ হিসেবে অভিহিত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাজানি এর সমর্থন করেন। একই সাথে তিনি পেড্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন স্পেন সরকারের অভিবাসন নীতির তীব্র সমালোচনা করে একে অত্যন্ত নমনীয় বা ‘নতি স্বীকারকারী’ নীতি হিসেবে অভিযুক্ত করেন।
ইতালির এই শীর্ষ কূটনীতিক বলেন, ‘মাদ্রিদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ইতালির নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে অন্য সব দেশ ইতালির নীতিকেই সমর্থন করছে।’
তাজানি আরও যোগ করেন, ‘সবাই ইউরোপে চলে আসুন—এই নীতিটি ভুল, কারণ ইউরোপ নির্বিচারে সবাইকে আশ্রয় দিতে সক্ষম নয়। এবং এটি একটি ভালো লক্ষণ যে ইউরোপীয় কমিশন স্পেনের নীতিকে বাদ দিয়ে ইতালির অবস্থানকে সমর্থন করেছে।’
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, স্পেন সরকার অভিবাসন ইস্যুটিকে ঘিরে ‘মতাদর্শগত কারসাজি’ করছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ‘প্রয়োজনীয় নীতি’ প্রণয়ন করা সম্ভব, যা কেবল ‘স্লোগান এবং মিথ্যা প্রতিশ্রুতি’র মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ইতালি আসলে কী প্রস্তাব করছে?
সরকারের লক্ষ্য হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে অবৈধ অভিবাসীদের ব্যবস্থাপনা ও ফেরত পাঠানোর জন্য একটি নেটওয়ার্ক বা কেন্দ্র গড়ে তোলা, যা মূলত অভিবাসীদের মূল দেশ ও ট্রানজিট দেশগুলোর সাথে সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।
গত জুনের শেষভাগে ইইউর নতুন বিধিমালা অনুমোদনের পর ইতালির প্রধানমন্ত্রী প্রথম এই ধারণাটি সামনে এনেছিলেন। রোম এখন এই পরিকল্পনাটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ইইউর অন্য ২৬টি সদস্য রাষ্ট্রের কাছে পেশ করতে চায়।
ইতালির প্রস্তাব অনুযায়ী, এই নতুন কেন্দ্রগুলোর অর্থায়ন করা হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ তহবিল থেকে।
প্রাথমিক তালিকায় আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ এবং প্রথাগত অভিবাসন রুটের বাইরের কিছু দেশ রয়েছে। এর মধ্যে সম্ভাব্য দেশগুলো হলো—ঘানা, সেনেগাল, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মৌরিতানিয়া, মিশর, উগান্ডা, ইথিওপিয়া, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়া এবং মন্টিনিগ্রো।
উগান্ডা ও জিএসপি+ সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ
উগান্ডাকে এই তালিকার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং নেদারল্যান্ডস ইতিমধ্যে এই আফ্রিকান দেশটিতে সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।
মন্টিনিগ্রোকেও এই ইউরোপীয় কৌশলে যুক্ত করা হতে পারে, তবে আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান একটি অমীমাংসিত বিষয় হলো—ইইউ এবং জাতীয় পর্যায়ে কে কত অর্থায়ন করবে, তা নির্ধারণ করা।
রোম একই সাথে জেনারেলাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্স বা জিএসপি+ কর্মসূচির আরও কঠোর প্রয়োগের দাবি জানাবে, যা চলতি বছরের শুরুতে অনুমোদিত হয়েছে এবং ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে।
এই ব্যবস্থার আওতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দেওয়া বাণিজ্য সুবিধা ও শুল্ক হ্রাসকে ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশ করা তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতার সাথে যুক্ত করা হবে।
এর উদ্দেশ্য হলো—অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজ ও জোরদার করা এবং অভিবাসীদের মূল দেশগুলোর সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
আলবেনিয়ার গজাদের ও শেংজিন কেন্দ্র সচল করার তোড়জোড়
এর সমান্তরালে, সরকার চলতি বছরের শেষ নাগাদ আলবেনিয়ার গজাদের-এ ইতালীয় নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ সচল করার চেষ্টা করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেডোসি ব্যাখ্যা করে বলেন, লক্ষ্য হলো ‘চলতি বছরের শেষ নাগাদ এটিকে তার সর্বোচ্চ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা, অথবা আইনি জটিলতাগুলোর সমাধান হলে এর আগেই এটি সচল করা।’
প্রয়োজনীয় বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এই স্থাপনাটি হয় তার মূল কাজে ফিরে যাবে অথবা নতুন ইইউ বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবহার করা হবে।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় আলবেনীয় কেন্দ্রগুলোর ব্যাপক ব্যবহারের কথা ভাবা হয়েছিল, যার ধারণক্ষমতা ছিল প্রতি মাসে ৩,০০০ জন এবং বছরে ৩৬,০০০ জন অভিবাসী। এর উদ্দেশ্য ছিল দ্রুততম সময়ে বর্ডার বা সীমান্ত পদ্ধতি প্রয়োগ করে আশ্রয় আবেদনের পরীক্ষা করা। তবে গত বছরের এপ্রিল থেকে এই স্থানটি কেবল ফেরত পাঠানোর জন্য একটি ডিটেনশন বা আটক কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এরপর থেকে সেখানে মাত্র কয়েক শ মানুষ এসেছেন এবং ফেরত পাঠানো মানুষের সংখ্যাও সীমিত রয়ে গেছে।
গজাদের কমপ্লেক্সে ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য তিনটি আলাদা স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় কেন্দ্রটিতে ৮৮০টি শয্যা বা বেড রয়েছে। এছাড়া ১৪৪ জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি ইতালীয় প্রত্যাবাসন হোল্ডিং ইউনিট (সিপিআর) এবং ২০ জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি ছোট কারাগার রয়েছে।
মধ্য ভূমধ্যসাগরে আটক হওয়া এবং ইতালীয় যুদ্ধজাহাজে করে স্থানান্তর করা অভিবাসীদের প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করার জন্য শেংজিন বন্দরে একটি রিসেপশন সেন্টার বা অভ্যর্থনা কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। তবে এই স্থাপনায় জারিকৃত আটকের নির্দেশগুলো বিচারকদের দ্বারা অনুমোদিত না হওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি ধীর গতির হয়ে পড়েছে।
ইউরোনিউজ
