বুধবার, ১৯ই আগস্ট, ২০২৬   |   ৪ঠা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের আশ্রয় দেওয়া এবং এর দায়িত্ব ভাগাভাগি করা নিয়ে ইতালি ও জার্মানির মধ্যকার কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব ক্রমশ চরম আকার ধারণ করছে। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেসরকারি উদ্ধারকারী জাহাজগুলোর মাধ্যমে আসা অভিবাসীদের নতুন পরিসংখ্যান প্রকাশ করে জার্মানির কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে।

রোমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের অক্টোবরে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত জার্মান দাতব্য সংস্থাগুলো প্রায় ২২,৫০০ অভিবাসীকে ইতালির বিভিন্ন বন্দরে নিয়ে এসেছে। এই সময়ে বিভিন্ন বেসরকারি উদ্ধারকারী জাহাজের মাধ্যমে ইতালিতে মোট ৪২,৩০০ জন অভিবাসী এসেছেন।

ইতালির হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া এই অভিবাসীদের অর্ধেকেরও বেশির দায়িত্ব সরাসরি জার্মান দাতব্য সংস্থাগুলোর ওপর বর্তায়। এছাড়া জার্মান পতাকাবাহী কিন্তু ইউরোপের অন্যান্য দাতব্য সংস্থা পরিচালিত জাহাজের মাধ্যমে আরও ৪,৫০০ জন অভিবাসী ইতালিতে পৌঁছেছেন। ফলে বেসরকারি জাহাজে করে আসা মোট অভিবাসীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশেরই দায় জার্মানির ওপর চাপাচ্ছে রোম।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি জার্মানিকে এই অভিবাসীদের ব্যয়ভার বহনের জন্য আর্থিক অবদানের দাবি জানিয়েছেন। পিয়ানতেদোসি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অভিবাসীদের দেখভালের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত জার্মানি থেকে কোনো অভিবাসীকে ফেরত নেওয়ার বিষয়ে রোম কোনো আলোচনা করবে না।

নিয়ম অনুযায়ী, যেসব অভিবাসী প্রথমে ইতালি দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) প্রবেশ করে পরবর্তীতে জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, জার্মানি তাদের প্রথম দফায় তিনজনকে ইতালিতে ফেরত পাঠাতে চায়। কিন্তু রোম ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা এই অভিবাসীদের দেশে প্রবেশ করতে দেবে না এবং তাদের সরাসরি জার্মানিতেই ফেরত পাঠানো হতে পারে।

ইইউ-এর প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অভিবাসী যে দেশ দিয়ে ইইউ-তে প্রথম প্রবেশ করবেন, তাঁর আশ্রয়ের আবেদন যাচাইয়ের দায়িত্ব সেই দেশেরই। তবে গত জুন থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ইইউ নিয়মে এই ‘প্রথম প্রবেশকারী দেশের দায়িত্ব’ নীতি বহাল থাকলেও এর মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম এবং সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সংহতি বজায় রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।

ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, পিয়ানতেদোসি এবং জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ডট একটি যৌথ সমাধানে পৌঁছানোর জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ইতালির উপ-প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি বেসরকারি উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বার্লিন ও মাদ্রিদ সরকারের প্রতি তাদের সাহায্য সংস্থাগুলোকে ‘নিয়ন্ত্রণে রাখার’ আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন আর কোনো ‘অবৈধ অভিবাসী’ ইতালির উপকূলে নিয়ে না আসে।

ঝুঁকিপূর্ণ ভূমধ্যসাগর পথ নিয়ে এনজিওদের উদ্বেগ

রোম ও বার্লিনের মধ্যকার এই বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ইউরোপের সামগ্রিক অভিবাসন নীতি। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আসা অভিবাসীদের দেখভালের দায়িত্ব কার এবং তাদের পেছনে হওয়া ব্যয়ের বোঝা কে বহন করবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো এই বিপজ্জনক যাত্রাপথের নানা ঝুঁকির কথা তুলে ধরছে। সম্প্রতি ইতালির দাতব্য সংস্থা ‘ইমার্জেন্সি’ লিবিয়া উপকূলে একটি উপচে পড়া নৌকা থেকে ৫৭ জনকে উদ্ধারের খবর দিয়েছে, যেখানে সাতজন মারা গেছেন। জার্মান সংস্থা ‘সী-ওয়াচ’ এবং ‘রেসকিউশিপ’ও ভূমধ্যসাগর থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মতে, মধ্য-ভূমধ্যসাগরীয় পথটি বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক অভিবাসন রুট। চলতি বছর এই পথে অন্তত ৮৭২ জন মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। তবে নথিভুক্ত ঘটনার বাইরে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version