ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ইতালি আজ এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি, দেশটির জনসংখ্যায় ধীরগতিতে বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মযোগ্য মানুষের সংখ্যা কমে আসছে, ফলে শ্রমবাজারে নতুন শক্তির প্রয়োজন তীব্র হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা ও ভূমিকা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক ইতালি ভিত্তিক অর্থনীতি ও সমাজ গবেষণা প্রতিষ্ঠান(লিওনে মোরেসা ফাউন্ডেশন) –এর একটি বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে যে ইতালিতে প্রায় ৫.৪ মিলিয়ন অভিবাসী বসবাস করছে, যাদের অনেকেই শ্রমশক্তিতে যুক্ত রয়েছে এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
একই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিদেশি শ্রমিকরা যুক্তভাবে প্রায় ১৭৭ বিলিয়ন ইউরো অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন করেছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশের সমান, এটি অস্পষ্টভাবে একটি বড় অর্থনৈতিক ভূমিকা নির্দেশ করে।
ইতালিতে প্রায় ২.৪-২.৫ মিলিয়ন বিদেশি শ্রমিক সরাসরি কর্মজীবনে যুক্ত রয়েছে, যা দেশটির সমগ্র শ্রমশক্তির প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। এই শ্রমিকরা বিশেষত কৃষি, নির্মাণ, পরিষেবা, আতিথেয়তা ও সেবা‑খাতসহ এমন অনেক খাতে কাজ করছেন যেখানে স্থানীয় কর্মীরা সহজেই যোগ দিতে চান না বা সেই খাতে প্রবেশের আগ্রহ কম।
বিদেশি শ্রমিকরা শুধু কাজই করছেন না, তারা দেশটির কর এবং রাজস্বেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। গবেষণায় দেখা যায় প্রায় ৪.৩ মিলিয়ন বিদেশি ট্যাক্সদাতা ইতালিতে আয়কর ও অন্যান্য কর প্রদান করছেন, যা দেশের রাজস্ব আয়কে সমর্থন দেয়। উদ্যোক্তা হিসেবেও বিদেশি নাগরিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছর প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার বিদেশি মালিকানাধীন ব্যবসা ছিল, যা মোট ব্যবসার প্রায় ১০.৬ শতাংশের মতো। এই উদ্যোগগুলি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে, মূলধারার অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে এবং স্থানীয় বাজারে প্রবৃদ্ধি আনছে।
ইতালির বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো জনসংখ্যার পতন ও বৃদ্ধশীল জনগোষ্ঠী. চলতি বছর মাত্র ৩ লাখ ৭০ হাজারটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে, যা ১৮৬১ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন। এদিকে কর্মযোগ্য জনগোষ্ঠী দিনে দিনে কমছে, এবং ২০৪০ সালের মধ্যে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ৭ মিলিয়নেরও বেশি কমে যেতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক শক্তি ও সামাজিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এর ফলে অভিবাসন এখন শুধুমাত্র একটি সামাজিক বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষার একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
ইতালীয় সরকার এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েছে এবং ২০২৬-২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০টি কর্ম ভিসা ইস্যুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যাতে শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণ করা যায় এবং আইনি অভিবাসনের মাধ্যমে কার্যকর শ্রমবাজার নিশ্চিত করা যায়। এতে বোঝা যায় যে দেশটি শুধুমাত্র অভিবাসী সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং আইনি ও নিয়মিত অভিবাসন প্রবাহকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে চায়।
যদিও বিদেশি শ্রমিকরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে, তবুও ইটালিয়ান শ্রমবাজারে তাদের অবস্থান সবসময় সমান নয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে বিদেশি কর্মীরা গড়ে ইতালীয় কর্মীদের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম মজুরি পান, যা শ্রমবাজারে বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। এমনকি এই পার্থক্য শুধুই মজুরিতে নেই, কিছু খাতে তারা কম দক্ষ কাজেই নিম্ন ও মাঝারি স্তরে বেশি যুক্ত থাকেন, যেখানে ভবিষ্যত উন্নয়ন বা পেশাগত উন্নতির সুযোগ সীমিত।
ইতালিতে অভিবাসনের ফলে কিছু সামাজিক চাপ ও সংশ্লিষ্ট জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। একটি গবেষণা দেখায় অধিকাংশ অভিবাসী পরিবার দারিদ্র্য সীমার উপরে বা কাছাকাছি জীবিকা নির্বাহ করছেন, যা ইটালিয়ান পরিবারগুলির তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি। অর্থাৎ, যদিও তারা দেশে কার্যকর অবদান রাখছেন, তাঁদের যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো আছে সেটা প্রশমন ও সমাধানের জন্য আরও নীতি পরিমাপের প্রয়োজন।
ইতালির অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে প্রায় ২ লাখ বাংলাদেশি ইতালিতে বসবাস করছে, যদিও অননুমোদিত বা অনিয়মিত প্রবেশের পরিসংখ্যান এটি আরও বেশি দেখাতে পারে। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভূভাগীয় বিপজ্জনক রুট (বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি) ধরে অন্তত ৯ হাজর ৭৩৫ জন বাংলাদেশি ইতালিতে পৌঁছেছেন, যা বিপজ্জনক অভিবাসনের চ্যালেঞ্জকেও সামনে রাখে।
তবে একই সঙ্গে আইনি পথে শ্রমিক ধারণের সুযোগও বাড়ছে, বিশেষত ২০২৬ থেকে ইটালির ভিসা পরিকল্পনার মাধ্যমে, যেখানে বাংলাদেশসহ নন‑ইইউ দেশগুলোর নাগরিকদের জন্যও সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ থেকেও দক্ষ কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনা ও দক্ষতা উন্নয়নের গুরুত্ব বাড়ছে, কারণ ইউরোপীয় শ্রমবাজারে ভাষা, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে সঠিক প্রস্তুতি থাকলে বাংলাদেশীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
ইতালির অভিবাসন পরিস্থিতি আজ একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা প্রকাশ করছে, একদিকে জনসংখ্যাগত পতন ও শ্রমক্ষেত্রে চাপের কারণে দেশটি বিদেশি শ্রমিকদের ওপরও নির্ভরশীল হচ্ছে, এবং অন্যদিকে অভিবাসীদের অভ্যন্তরীণ জীবনে বৈষম্য, মজুরি পার্থক্য ও সামাজিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যদিও শ্রমশক্তি ও জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষায় অভিবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, পুনরায় উন্নত নীতি, ভাষা‑দক্ষতা উন্নয়ন, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা এবং শ্রমবাজারে সমান সুযোগ তৈরি করা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি অভিবাসন ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত ও সমন্বিতভাবে ব্যবস্থাপিত হয়, তাহলে এটি দেশটির অর্থনৈতিক সমস্যা ও জনসংখ্যাগত সংকটের একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে।
