শুক্রবার, ২৮ই আগস্ট, ২০২৬   |   ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতালির স্কুলগুলোর শ্রেণিকক্ষে অভিবাসী শিশুর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব করেছে জর্জিয়া মেলোনির সরকার।প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছেন ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা। স্কুলে মেয়ে শিক্ষার্থীদের বোরখা পরার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করতে চান তিনি।

অভিবাসীদেরকে সমাজের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং তাদের নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে আটকে থেকে সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা (কালচারাল ঘেটো) তৈরি হওয়া রুখতে বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা ভাবছে দেশটির রক্ষণশীল জোট সরকার। তারই অংশ হিসেবে অভিবাসী শিশুদের মা-বাবার জন্য ইতালিয়ান ভাষা শেখার ক্লাস বাধ্যতামূলক করতে চায় ইতালির সরকার।

সন্তানদের স্কুলে না পাঠালে অভিভাবকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হতে পারে এবং দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

ইতালির শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিশুদের অনুপাত মাত্রাতিরিক্ত না হওয়াটা জরুরি। কারণ তাদের সংখ্যা বেশি হলে তাদের পক্ষে ইতালীয় ভাষা এবং আমাদের সমাজের মূল্যবোধ শেখা কঠিন হয়ে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেসব শিশু স্কুলে ভালো ফল করতে পারছে না, তাদের মা-বাবার জন্য ইতালীয় ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব তুলব আমি।’তবে এই নতুন নিয়ম গৃহীত হলে তা কীভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।

ভালদিতারা বলেন, যেসব অভিবাসী পরিবারে ইতালীয় ভাষা তেমন বলা হয় না, সেসব পরিবারের শিশুরা স্কুলে যা সেখে, বাড়ি ফিরে তা যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ‘অভিভাবকদের আমাদের ভাষা জানা এবং শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা জরুরি। অথচ এটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বিদেশি শিশুদের অনেক অভিভাবকই স্কুলে আসেন না।’

তিনি জানান, ইতালিয়ান শিশুদের মধ্যে স্কুলে অনুপস্থিতির হার মাত্র ৬ শতাংশ হলেও, অভিবাসী শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ২৬ শতাংশ।

ভালদিতারা বলেন, আগামী শরতে শিক্ষক, শ্রমিক ইউনিয়ন, ছাত্র পরিষদ ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে আয়োজিত এক সম্মেলনে এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ইতালি অভিবাসীদের ‘স্বাগত জানায়’, তবে তাদেরও দেশটির ‘স্বকীয়তা ও মূল্যবোধ’ বুঝতে হবে।

গত কয়েক দশকের অভিবাসনে ইতালির জনবিন্যাসে পরিবর্তন এসেছে। মূলত শ্বেতাঙ্গ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দেশ থেকে ইতালি এখন ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের মতো বহুসংস্কৃতির সমাজে রূপ নিয়েছে।

বর্তমানে ইতালির স্কুলগুলোতে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার অ-ইতালীয় শিশু পড়াশোনা করছে, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ১২ শতাংশ। দুই দশক আগেও এই হার ছিল ৩.৫ শতাংশ।

কিছু কিছু স্কুলে এই হার আরও বেশি—বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে, যেখানে তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ অর্থনীতি অধিকসংখ্যক অভিবাসী পরিবারকে আকৃষ্ট করে।

অভিবাসী শিশুদের প্রায় ৪৩ শতাংশ এসেছে মূলত ইউরোপের রোমানিয়া, আলবেনিয়া, ইউক্রেন ও মলদোভা থেকে। প্রায় ৩২ শতাংশ এসেছে মরক্কো, মিশর, তিউনিসিয়া, নাইজেরিয়া ও সেনেগালের মতো আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে।

এক-পঞ্চমাংশ এসেছে এশিয়া থেকে—মূলত বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ফিলিপাইন ও পাকিস্তান থেকে। ৮ শতাংশের সামান্য বেশি এসেছে লাতিন আমেরিকা, মূলত ইকুয়েডর ও পেরু থেকে থেকে।

তবে যেসব অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাবেন না, তাদের কারাদণ্ড দেওয়ার প্রস্তাবটিকে ‘অদূরদর্শী’ বলে সমালোচনা করেছে শিক্ষকদের ইউনিয়ন এফএলসি-সিজিআইএল।

এ ইউনিয়ন বলেছে, ‘অভিবাসী শিশুদের অভিভাবকদের জন্য ইতালীয় ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা কোনোভাবেই সমাজে একীভূতকরণের পদক্ষেপ নয়। এটি আদেশের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের শাস্তি, যা ঠিক বিপরীত পরিণতি ডেকে আনার ঝুঁকি তৈরি করে। বাধ্যতামূলক করা হলে তা পরিবারগুলোকে স্কুলের কাছাকাছি নিয়ে আসবে না, বরং তাদের কেবল অপরাধী হিসেবেই সাব্যস্ত করবে।’

সমালোচকরা বলছেন, অভিবাসন ও পরিচয়ের মতো বিষয়গুলোতে ইতালির সরকার ক্রমেই কট্টর অবস্থান নিচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে ইতালির সেনাবাহিনীর সাবেক বিশেষ বাহিনীর কমান্ডার রবের্তো ভান্নাচ্চির হাতে প্রতিষ্ঠিত একটি নতুন কট্টর-ডানপন্থি দলকে পেছনে ফেলার উদ্দেশ্যেই সরকার এই কৌশল নিয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, ভান্নাচ্চির দল ন্যাশনাল ফিউচার জাতীয় ভোটের ৭ শতাংশেরও বেশি সমর্থন পেয়েছে। এটি ক্ষমতাসীন জোটের তিন দলের অন্যতম দ্য লিগের জনপ্রিয়তার চেয়ে বেশি।

আফগানিস্তান ও ইরাকে দায়িত্ব পালনকারী ভান্নাচ্চি চলতি সপ্তাহে তার দলের ইশতেহারের আরও কিছু বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছেন। এতে তিনি নিরাপত্তা বজায় রাখতে ইতালির শহর ও নগরগুলোর রাস্তায় সেনা মোতায়েন এবং স্কুলগুলোতে সামরিক মূল্যবোধ শেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি কিশোর-কিশোরীদের জন্য পিউবার্টি ব্লকার (বয়ঃসন্ধি বিলম্বিত করার চিকিৎসাপদ্ধতি) এবং লিঙ্গ পরিবর্তন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি গর্ভপাতের সুযোগ সীমিত করতে চান। সমকামী যুগলদের মধ্যে সিভিল ইউনিয়ন নিষিদ্ধ এবং অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিতর্কিত নীতি অনুসরণ করবে তার দল।

মধ্য-বামপন্থি বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা আলেসান্দ্রো জান বলেন, এই ইশতেহারটি ‘প্রায় নাৎসিবাদের শামিল’।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version