শুক্রবার, ২৮ই আগস্ট, ২০২৬   |   ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পর্তুগালের লিসবন বিমানবন্দরে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, মিটার চালু না করা এবং ভুল পথ দিয়ে ঘুরিয়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মতো ভয়াবহ ট্যাক্সি জালিয়াতির খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এই জালিয়াতির খবরের মাঝেই লিসবনের হুমবার্তো ডেলগাডো বিমানবন্দর এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ট্যাক্সি চালকদের বিরুদ্ধে ৬৭টি জালিয়াতির মামলা করেছে পুলিশ।

পর্তুগালে বসবাসরত জসিয়ান নেশন নামের এক জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর তাঁর ফেসবুক পেজে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে এই ট্যাক্সি জালিয়াতিকে ‘পর্যটকদের জন্য একটি বড় ফাঁদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, ট্যাক্সি চালকেরা নিয়ম ভেঙে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন অথবা স্রেফ মিটার চালু না করেই গাড়ি চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘লিসবনের ট্যাক্সিগুলো এখন স্রেফ প্রতারণার আখড়া।’

ভিডিওতে তিনি দুটি সাধারণ জালিয়াতির চিত্র তুলে ধরেন। প্রথমত, চালকেরা বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় মিটার চালু না করে সরাসরি যাত্রীর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট ভাড়ার চুক্তি করে নেন। দ্বিতীয়ত, চালকেরা শুরুতে কোনো দাম নির্ধারণ করেন না এবং মিটারও বন্ধ রাখেন, যার ফলে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তারা নিজেদের ইচ্ছামতো অবাস্তব ভাড়া দাবি করেন।

রেডিট-এর এক ব্যবহারকারী তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আমি ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিত বিমানবন্দর থেকে লারগো দো রাতো পর্যন্ত ট্যাক্সিতে যাতায়াত করি, যার ভাড়া সাধারণত ১১ ইউরোর বেশি হয় না। কিন্তু এই সপ্তাহে দুইবার চালকেরা আমার সঙ্গে জালিয়াতি করার চেষ্টা করেছে। তারা মোবাইল অ্যাপে ভুয়া ট্যাক্সি মিটার দেখিয়ে এবং ফালতু দীর্ঘ পথ দিয়ে ঘুরিয়ে আমার কাছে ১৯ থেকে ২১ ইউরো দাবি করেছে এবং তা ক্যাশে পরিশোধ করতে বাধ্য করেছে।’

পর্তুগালে বসবাসরত তুর্কি সাংবাদিক জেইনেপ তিনাজ রেডমন্ট মে মাসে ‘দিয়ারিও দে নোতিসিয়াস’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘লিসবন বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সি নেওয়া এখন অত্যন্ত মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিমানবন্দর যাওয়ার ভাড়া ১৪ ইউরোর বেশি হয় না, কিন্তু ফেরার পথ ভিন্ন।’ তিনি তাঁর এক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমি যখন চালককে মিটার চালু করার অনুরোধ করি, সে হঠাৎ ব্রেক কষে আমাকে বলে—নামতে চাইলে এখনই নেমে যান, এই পথের নির্দিষ্ট ভাড়া ২৫ ইউরো।’

এই ব্যাপক গণ-অভিযোগের প্রেক্ষিতে লিসবন মেট্রোপলিটন পুলিশ হুমবার্তো ডেলগাডো বিমানবন্দরের আগমনী (অ্যারাইভাল) জোনে এক বড় ধরনের সড়ক তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করে।

পুলিশের দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, গত মঙ্গলবারের এই বিশেষ অভিযানে প্রায় একশটি ট্যাক্সি তল্লাশি করা হয়েছে এবং এতে মোট ৬৭টি গুরুতর ট্রাফিক ও জালিয়াতির অপরাধ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি মামলা দেওয়া হয়েছে ‘ট্যাক্সি মিটারে কারসাজি করার বা অসদুপায়ে মিটার লুকিয়ে রাখার’ অপরাধে।

বাকি মামলাগুলোর মধ্যে ৮টি ছিল ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ট্যাক্সি ড্রাইভার সার্টিফিকেট না থাকার কারণে, ৬টি ছিল প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে, ৬টি ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের জন্য, ৩টি ছিল গাড়ির ফিটনেস না থাকার অপরাধে এবং ৩টি ছিল বাধ্যতামূলক ‘গ্রুপ ২’ সার্টিফিকেট ছাড়া গাড়ি চালানোর জন্য।

এছাড়া ট্যাক্সি মিটারের ক্যালিব্রেশন জালিয়াতি, গাড়ির জরাজীর্ণ অবস্থা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং ফিটনেস না থাকার দায়েও মামলা দেওয়া হয়েছে।

তবে পুলিশের এই ঝটিকা অভিযানকে স্বাগত জানাতে পারেনি পর্তুগালের লাইট ভেহিকেল রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন। তারা পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিমানবন্দরে স্রেফ ‘মিডিয়া শো’ বা প্রচারণার নাটক করার অভিযোগ তুলেছে।

অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, এই অভিযানের কারণে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং ট্যাক্সি স্ট্যান্ড খালি হয়ে যায়, যা পর্তুগালে পা রাখা বিদেশি পর্যটকদের কাছে দেশের একটি ‘ভীতিকর ও অবমাননাকর’ চিত্র তুলে ধরেছে।

তারা স্পষ্ট করেছে যে—আইনগত তল্লাশির বিরুদ্ধে তাদের কোনো আপত্তি নেই এবং তারা নিজেরাও অবৈধ দালালের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কিন্তু যাত্রীরা গাড়িতে বসা থাকা অবস্থায় এভাবে তল্লাশি চালানো এবং বিমানবন্দরের এই স্পর্শকাতর স্থানে এমন নাটকীয় অভিযান পরিচালনার পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, এই অভিযান ট্যাক্সি শিল্প ও সাধারণ যাত্রী—উভয়েরই ব্যাপক ক্ষতি করেছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version