পর্তুগালের মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হারে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে। লিসবন, সেতুবাল এবং আলগারভে অঞ্চলে মাধ্যমিক স্কুল সম্পন্ন করার হার উত্তরের তুলনায় বেশ কম। পর্তুগালের পরিসংখ্যানগত ডেটাবেস ‘পোর্ডাটা’-র সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
ফ্রান্সিসকো ম্যানুয়েল দো সান্তোস ফাউন্ডেশনের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী আঞ্চলিক ব্যবধান ছাড়াও স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর অনুপাতে পরিবর্তন এবং উচ্চশিক্ষায় বিশেষ করে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রতিবেদনের অন্যতম প্রধান তথ্য হলো দ্বাদশ শ্রেণী সম্পন্ন করার হারের মধ্যকার বৈষম্য। গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, ‘মাধ্যমিক শিক্ষায় বৃহত্তর লিসবন, সেতুবাল উপদ্বীপ এবং আলগারভে অঞ্চলে প্রত্যাশিত তিন বছরের মধ্যে পড়াশোনা সম্পন্ন করার হার সবচেয়ে কম, বিশেষ করে সরকারি স্কুলগুলোতে।’
উত্তরাঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোতে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে যারা সাধারণ মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা শুরু করেছিল, তাদের ৮১ শতাংশ তিন বছর পর তা সম্পন্ন করেছে। কিন্তু বৃহত্তর লিসবন অঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোতে এই হার ছিল মাত্র ৬৭ শতাংশ। বৃত্তিমূলক বা ভোকেশনাল কোর্সের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ, যেখানে মাত্র ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়ালেখা সম্পন্ন করতে পেরেছে।
প্রাথমিক শিক্ষার তৃতীয় স্তরে (৭ম, ৮ম এবং ৯ম শ্রেণী) উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের স্কুলগুলোতে পড়াশোনা সম্পন্ন করার হার জাতীয় গড়ের ওপরে রয়েছে, যা প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে, বৃহত্তর লিসবন এবং আলগারভে অঞ্চলে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে এই হার ছিল ৮৫ শতাংশের নিচে।
সর্বশেষ বার্ষিক সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে পর্তুগালের শিক্ষা ব্যবস্থায় মোট ২০ লাখ ৭৮ হাজার ১১৬ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, যা আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ৯,৩২৬ জন বেশি। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯,০০০ এবং উচ্চশিক্ষায় প্রায় ৮,০০০ বৃদ্ধি পাওয়ায় মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে।
এই প্রবৃদ্ধির ধারা জন্মহারের পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করেছে এবং এটি মূলত অভিবাসী বাড়ার কারণে শক্তিশালী জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রতিফলন। বিপরীতে, প্রাক-প্রাথমিক বা প্রি-স্কুল স্তরে প্রায় ৪,০০০ এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় ৩,০০০-এর বেশি শিক্ষার্থী কমেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ৪৫ শতাংশের বেশি শিশু বেসরকারি নার্সারিগুলোতে পড়াশোনা করছে। প্রাথমিক ও সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি স্কুলে পড়াশোনা করে। তবে বৃত্তিমূলক বা ভোকেশনাল মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অবদান প্রায় অর্ধেক।
পর্তুগালে উচ্চশিক্ষায় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রি-স্কুল, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অন্তত এক বা উভয় অভিভাবক বিদেশি এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৬ হাজার ১১। উচ্চশিক্ষায় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা গড়ে প্রতিবছর ৪,০০০ করে বাড়ছে।
বিগত ১৫ বছরে পর্তুগালে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা চার গুণ বেড়েছে। ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে যেখানে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল ২০ হাজার, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজারে। ইন্টিগ্রেটেড মাস্টার্স প্রোগ্রামগুলোতে এই প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে, যেখানে ২০১০ সালে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল ৩,২৮২ জন এবং ২০২৫ সালে তা সাত গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২,৫২৩ জনে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে পর্তুগিজ উচ্চশিক্ষায় সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়া পাঁচটি দেশ হলো—ব্রাজিল, অ্যাঙ্গোলা, গিনি-বিসাউ, ফ্রান্স এবং ইতালি।
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে পর্তুগালে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সংখ্যা ৪ লাখ ৫৬ হাজার ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ২ শতাংশ এবং দশ বছর আগের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (স্টেম) বিভাগে নতুন শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। গত ১০ বছরে এই বিভাগে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৭,৩০৪ থেকে বেড়ে ২৭,১৯৩ জনে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ১০ হাজার বেশি।
বিপরীতে, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রথম বছর পরই পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার হার ২০২২-২৩ বা ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে পর্তুগালের নতুন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের অভাব একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটিতে প্রতিবছর অবসর নেওয়া শিক্ষকের সংখ্যা যেখানে তিন হাজার, সেখানে নতুন গ্র্যাজুয়েট শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র দুই হাজার।
নতুন গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে শিক্ষা বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্নকারীদের ৪০ শতাংশই প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষক। মাধ্যমিক স্তরের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের হার মাত্র ২০ শতাংশ, যা আগামীতে শিক্ষক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
