পর্তুগালের বিলুপ্ত ইমিগ্রেশন পুলিশ ‘এসইএফ’-এর আদলে গঠিত বিশেষায়িত পুলিশ উইং ‘ন্যাশনাল ইউনিট ফর ফরেনার্স অ্যান্ড বর্ডারস’ তাদের কার্যক্রমের প্রথম বছর পূর্ণ করেছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘মিনি-এসইএফ’ নামে পরিচিত এই নতুন ইউনিটটি প্রথম ১২ মাসে পর্তুগালের বিমানবন্দরগুলোতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশি নাগরিকদের ওপর নজরদারি সংক্রান্ত অভিযানে প্রায় ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট যাত্রা শুরু করা এই ইউনিটটি মূলত পর্তুগালের আকাশসীমা বা বিমানবন্দরগুলোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করছে। প্রথম এক বছরে তারা পর্তুগিজ বিমানবন্দরগুলোতে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি যাত্রী পারাপার তদারকি করেছে।
পর্তুগাল পুলিশের পিএসপি সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এবং স্থানীয় দৈনিক ‘জর্নাল দে নোতিসিয়াস’-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী—কেবল বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ অভিযানেই ৪২৮ জন যাত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভুয়া বা জালিয়াতি করা নথিপত্র ব্যবহার এবং পূর্বে জারি করা আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার কারণে তাদের আটক করা হয়। একই সময়ে, ইউএনইএফ-এর প্রায় ১,৫০০ পুলিশ কর্মকর্তা দেশজুড়ে ৫,৩৯৭টি বিশেষ পরিদর্শন ও তল্লাশি অভিযান চালিয়েছেন, যার অধীনে ৫২,৪২১ জন অভিবাসীর নথিপত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। এই অভিযানে অবৈধভাবে অবস্থান করার দায়ে আরও ২৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পর্তুগাল থেকে স্বেচ্ছায় চলে যাওয়ার জন্য ৮৩১ জনকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
সাফল্যের পাশাপাশি প্রথম এক বছর বিমানবন্দরে দীর্ঘ লাইনের চরম ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনার কারণে মারাত্মক সমালোচনার মুখে পড়েছে নতুন এই পুলিশ ইউনিটটি। বিশেষ করে লিসবনের হুমবার্তো ডেলগাডো বিমানবন্দরে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। গত অক্টোবরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এন্ট্রি/এক্সিট সিস্টেম’ চালু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে পড়ে, যা মূলত ইইউ-এর বাইরের দেশগুলোর নাগরিকদের বায়োমেট্রিক ও ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
গত ১৪ অক্টোবর খোদ পিএসপি পুলিশ লিসবন বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পরিস্থিতিকে ‘গুরুতর’ বা ক্রcritical বলে বর্ণনা করেছিল, যেখানে অপেক্ষার সময় ৯০ মিনিট ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ডিসেম্বরে ইমিগ্রেশন জট তীব্র আকার ধারণ করলে ততকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া লুসিয়া আমারাল একে ‘অসহনীয় পর্যায়’ বলে অভিহিত করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার অতিরিক্ত ৮০ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ করে, ইইএস ব্যবস্থার প্রয়োগ তিন মাসের জন্য স্থগিত করে এবং জাতীয় গার্ড ‘জিএনআর’ সদস্যদের তলব করে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইউরোপীয় কমিশন লিসবন বিমানবন্দরে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই একটি ঝটিকা পরিদর্শন চালায় এবং এর বাহ্যিক সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে ‘গুরুতর ত্রুটি’ সনাক্ত করে। কমিশনের প্রতিবেদনে জালিয়াতি করা নথিপত্র সনাক্তকরণে পুলিশের ব্যর্থতা, চরম জনবল সংকট এবং দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ের কড়া সমালোচনা করে বলা হয়—এটি সমগ্র শেনজেন অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসেও সিস্টেমের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে লিসবন বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হতে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছিল।
পুলিশ প্রফেশনালস ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পাওলো সান্তোস মনে করেন, প্রথম বছর হিসেবে পিএসপি পুলিশ তাদের অভিষেক অভিযানে একটি ‘চমৎকার কাজ’ করেছে, যদিও শেখা ও মানিয়ে নেওয়ার এই বছরটি অত্যন্ত ‘কঠিন এবং পরিশ্রমে ভরা’ ছিল। তিনি বিশেষ করে জাল নথিপত্র সনাক্তকরণে আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার এবং উন্নত আইটি অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পুলিশের অর্জনের প্রশংসা করেন, যা পিএসপি-কে ইউরোপের অন্যতম আধুনিক পুলিশ বাহিনীতে রূপান্তর করেছে।
তবে সান্তোস সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিমানবন্দরের সীমান্ত নিরাপত্তা বাড়াতে গিয়ে পর্তুগালের ভেতরের সাধারণ থানাগুলো চরম জনবল সংকটের মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘দেশের সাধারণ থানাগুলোতে এখন পর্যাপ্ত কর্মী নেই।’
সেইসাথে কাজের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই ইউনিয়ন নেতা। তিনি ইউএনইএফ-এর ব্যবহৃত গাড়িগুলোকে ‘পুরোনো ও জরাজীর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়া লিসবনে আবাসন সংকটের কারণে যেখানে আগে এসইএফ-এর সময়ে মাত্র ১০০ জন কর্মী কাজ করতেন, এখন সেখানে গাদাগাদি করে ৪০০ জনেরও বেশি পুলিশকে কাজ করতে হচ্ছে।
ইউএনইএফ-এর দ্বিতীয় বর্ষের কার্যক্রমের শুরুতে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের কাজের পরিবেশ উন্নত করা, বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সাধারণ থানাগুলোর নিরাপত্তা বা সক্ষমতা নষ্ট না করে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।
