রেকর্ড পরিমাণ যাত্রী পরিবহন এবং সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা সত্ত্বেও কেবল বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার কারণে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে পর্তুগালের জাতীয় বিমান সংস্থা ‘টিএপি এয়ার পর্তুগাল’।
আজ সোমবার বিমান সংস্থার পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে—চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) অপারেটিং আয় ও যাত্রী সংখ্যায় রেকর্ড গড়লেও, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে তাদের মুনাফায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে যেখানে টিএপি-র লোকসান ছিল প্রায় ৭ কোটি (৭০ মিলিয়ন) ইউরো, এ বছর তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিবৃতি অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার কারণে বিমান রিফুয়েলিং বা জ্বালানি সংগ্রহের পেছনে টিএপি-কে গত বছরের প্রথমার্ধের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ (১৮.৭%) বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
জ্বালানি তেলের এই অতিরিক্ত খরচটি মূলত বিমান সংস্থার সার্বিক ইতিবাচক পারফরম্যান্সে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই সেমিস্টার বা ছয় মাসে টিএপি যাত্রী সংখ্যায় (৮০ লাখ ছাড়িয়েছে) এবং রাজস্ব আয়ে (২ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে) নতুন রেকর্ড গড়েছে।
টিএপি-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লুইস রড্রিগেস বলেন, ‘বছরের প্রথমার্ধের পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে টিএপি-র ব্যবসায়িক মডেল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আমাদের নেটওয়ার্কজুড়ে টিকিটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমাদের টিমগুলোর কঠোর পরিশ্রম এবং কোম্পানির সহনশীলতার কারণেই আমরা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার এই বিশাল চ্যালেঞ্জকে অনেকাংশে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি।’
তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় তার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বিমানের জ্বালানি খরচে পড়েছে। কিন্তু টিকিটের মূল্য বাড়িয়ে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কাজটি ছিল অত্যন্ত ধীরগতির। কারণ দ্বিতীয় কোয়ার্টারের (এপ্রিল-জুন) সিংহভাগ টিকিটই জ্বালানির দাম বাড়ার অনেক আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।
যাত্রী ও রাজস্বে নতুন রেকর্ড:
অপারেটিং আয়: ৪.৩ শতাংশ বেড়ে ২,০৩৯.৮ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে।
টিকিট বিক্রি বাবদ আয়: ৪.৪ শতাংশ বেড়ে ১,৮২৯.২ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার কৌশলগত বাজারগুলোতে টিএপি-র টিকিটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি ছিল।
যাত্রী পরিবহন: জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে টিএপি ৮২ লাখ (৮.২ মিলিয়ন) যাত্রী পরিবহন করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪.২ শতাংশ বেশি।
ফ্লাইট সংখ্যা: এই সময়ে তারা ৫৭,৫০০টি ফ্লাইট পরিচালনা করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ০.৩ শতাংশ বেশি।
রড্রিগেস আরও জানান, ইউরোপীয় কমিশনের অনুমোদিত পুনর্গঠন পরিকল্পনা সফলভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে টিএপি এখন একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। আগামী এক দশকের জন্য তারা একটি নতুন কৌশলগত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, যার অধীনে ডিজিটাল গতিশীলতা ও উদ্ভাবন কর্মসূচি ‘হরাইজন প্রোগ্রাম’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী করতে কোম্পানিটি সম্প্রতি ৩৫০ মিলিয়ন ইউরোর বন্ড ইস্যু করেছে। জুন শেষে কোম্পানির হাতে নগদ জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,২২২.১ মিলিয়ন ইউরো।
টিএপি-র এই আর্থিক হিসাব এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন বিমান সংস্থাটির ৪৪.৯ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি খাতের কাছে হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ইউরোপের দুই শীর্ষ বিমান সংস্থা ‘এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম’ এবং ‘লুফথানসা’ ইতিমধ্যে টিএপি-র শেয়ার কেনার জন্য তাদের চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক দরপত্র জমা দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় হোল্ডিং কোম্পানি ‘পারপাবলিকা’ আগামী ১ সেপ্টেম্বর এই দরপত্রগুলো বিশ্লেষণের চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেবে, যার পরেই সরকার বিজয়ী প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করবে। আর এই বিমান বিক্রির প্রক্রিয়া ও তেলের দামের ধাক্কা মেলানোর চ্যালেঞ্জ নিয়েই এখন সামনে এগোচ্ছে পর্তুগালের এই বিমান সংস্থা।
