পর্তুগাল ভ্রমণে ইইউ-এর বাইরের দেশগুলো থেকে আসা পর্যটক এবং নন-ইইউ প্রবাসীদের জন্য বড় ধরনের দুঃসংবাদ দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টিনিগ্রো। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর থেকে পর্তুগালের বিমানবন্দরে তৃতীয় দেশের নাগরিকদের জন্য শতভাগ বায়োমেট্রিক ডাটা (আঙুলের ছাপ ও ছবি) সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
লিসবন বিমানবন্দর পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী মন্টিনিগ্রো এই বড় ঘোষণা দেন। এই বিমানবন্দরটি পূর্বে বায়োমেট্রিক পরীক্ষার কারণে দীর্ঘ সময় ফ্লাইট বিলম্বের জন্য কুখ্যাত ছিল। সে সময় ভিড় এড়াতে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা মাঝে মাঝে সাময়িকভাবে বায়োমেট্রিক ডাটা সংগ্রহ স্থগিত রাখতেন। কিন্তু নতুন নিয়মে সেই সুযোগ আর থাকছে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৬ সেপ্টেম্বর থেকে আমাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোর নাগরিকদের শতভাগ বায়োমেট্রিক ডাটা সংগ্রহ করতে হবে, যা ইমিগ্রেশনের কাজের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।’ তিনি স্বীকার করেন যে, এই নিয়মের ফলে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক পরিচালন প্রক্রিয়া বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও ধীরগতির মুখে পড়বে, তবে সুরক্ষার স্বার্থে এই নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুইস নেভেস, অবকাঠামো মন্ত্রী মিগুয়েল পিন্টো লুজ এবং অর্থনীতি মন্ত্রী ম্যানুয়েল কাস্ত্রো আলমেইদাকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই বিমানবন্দর পরিদর্শন মূলত যাত্রীদের যাতায়াত সুবিধার চেয়ে ‘দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে’ বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সরকারি অবস্থানের প্রতিফলন।
কী এই ইউরোপীয় এন্ট্রি/এক্সিট সিস্টেম?
ইউরোপীয় এন্ট্রি/এক্সিট সিস্টেম বা ইইএস হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ব্যবস্থা, যা মূলত পাসপোর্টে সনাতন সিল মারার পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে অ-ইউরোপীয় নাগরিকদের বায়োমেট্রিক ডাটা (ছবি ও আঙুলের ছাপ) রেকর্ড করে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ইইউতে এটি ধাপে ধাপে চালু করা হয়েছে।
পর্তুগালসহ ইইউর আরও সাতটি দেশ এই নতুন নিয়মের কারণে বিমানবন্দরে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা এড়াতে আগামী সেপ্টেম্বরের পরও সাময়িকভাবে বায়োমেট্রিক স্থগিত রাখার সুযোগ বাড়ানোর জন্য ইউরোপীয় কমিশনের কাছে আবেদন করেছিল। কিন্তু ইউরোপীয় কমিশন সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে।
বিমানবন্দরে আরও ভোগান্তির আশঙ্কা
৬ সেপ্টেম্বর থেকে বিমানবন্দরে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ করা হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে আমলাতান্ত্রিক ভাষায় বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব, যা পরবর্তীতে আইটি ও প্রযুক্তিগত খাতে আরও বেশি বিনিয়োগের দিকে নিয়ে যাবে এবং চলমান প্রক্রিয়াগুলোকে আরও নিখুঁত করবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, পর্তুগালের পোর্তো বিমানবন্দরেও যাত্রী চাপ সামলাতে দ্রুত বড় ধরনের পরিকাঠামোগত বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, প্রযুক্তি ও জনবল বাড়ানোর ফলে পরিস্থিতির কিছুটা ‘ইতিবাচক উন্নতি’ হয়েছে। যদিও সমালোচকদের মতে—এই উন্নতি মূলত লাইনের ভিড় কমানোর জন্য মাঝেমধ্যে বায়োমেট্রিক পরীক্ষা স্থগিত রাখার কারণে হয়েছিল, যা এখন আর করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, ‘অপেক্ষা করার এই চাপ এখনই শেষ হচ্ছে না।’ দীর্ঘ লাইনের কারণে পর্তুগালের পর্যটন ও জাতীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার কথা স্বীকার করলেও তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না।
এর অর্থ হলো—যাঁরা পর্তুগালে যাতায়াত করবেন, তাঁদের লিসবন বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হতে এখন থেকে আরও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে।
একই সময়ে লিসবনের অতিরিক্ত বিমানবন্দর হিসেবে ‘মন্তিজো’ প্রকল্প বাতিল করার বিষয়ে পর্তুগিজ পর্যটন কনফেডারেশনের ক্ষোভ প্রকাশ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বিষয়টি এখন ‘সম্পূর্ণ অতীত ও বাতিল’। পরিবেশবাদীদের আপত্তির কারণে মন্তিজোতে আর কোনো বিমানবন্দর হচ্ছে না। ফলে অদূর ভবিষ্যতে পর্তুগাল যাতায়াতকারী নন-ইইউ যাত্রীদের জন্য ফ্লাইট জট ও ইমিগ্রেশন ভোগান্তি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে রাখল এই সফর।
