মঙ্গলবার, ৩রা নভেম্বর, ২০২৬   |   ১৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লিসবন ও পোর্তোয় আবাসন অধিকারের দাবিতে স্থাপিত তাঁবুগুলো সরাতে পাবলিক সিকিউরিটি পুলিশের (পিএসপি) কঠোর অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন পর্তুগালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুইস নেভেস। তিনি বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের মধ্যকার ‘একটি ছোট ও মুষ্টিমেয় গোষ্ঠী’ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বিষয়টিকে বারবার চ্যালেঞ্জ করছে।

তিনি বলেন, ‘নাগরিকেরা বিক্ষোভ করবে, তাদের দাবি ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরবে—এটি সম্পূর্ণ সঠিক। তবে বিক্ষোভকারীদের একটি ছোট গোষ্ঠী বারবার আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি ক্ষুণ্ন করছে এবং আসল সংকট ঠিক এখানেই।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বিশ্লেষণ অবশ্য নতুন কিছু নয়; এর আগেও তিনি এসব আন্দোলনের ভেতর ‘বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের অনুপ্রবেশের’ অভিযোগ করেছিলেন। মারিনহা গ্রান্দেতে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের এক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন।

সবাই শান্তিপূর্ণ সমাধান দেখতে পছন্দ করে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের দৃশ্য দেখে কেউই আনন্দিত নয়; এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দুঃখজনক।’ তিনি পোর্তোর উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে এমন সময়ও ছিল যখন বিক্ষোভকারীরা তাঁবু সরানোর পুলিশি নির্দেশ মেনে নিয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সম্পূর্ণ নজিরবিহীনভাবে পিএসপি পুলিশ অত্যন্ত শান্ত ও ধৈর্যশীল মনোভাব নিয়ে সমন্বয় বজায় রেখেছিল এবং অনুরোধ জানিয়ে আসছিল যে যেভাবে তাঁবুগুলো খাটানো হয়েছে তা রাখা যাবে না। কিন্তু আইন না মানার কারণে শেষ পর্যন্ত জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বলপ্রয়োগ বা সহিংসতার প্রয়োজন ছিল কি না—এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘কিছু সময় মানুষ পুলিশকে তাদের কাজ করতে দিয়েছে, আবার কখনো কখনো তা সম্ভব হয়নি।’
তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে যারা আইন মানতে বাধ্য তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের সংঘাত তৈরি হচ্ছে। এখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আইন মানার বিষয়টি জড়িয়ে আছে।’ তিনি মনে করিয়ে দেন যে অধিকার, স্বাধীনতা ও সুরক্ষার সব আইন পার্লামেন্টে পাস হয় এবং বিক্ষোভকারীরা প্রতি সন্ধ্যায় যে ধরনের গণসমাবেশ করছে তা কখনো সার্বিক জনগণের বিকল্প হতে পারে না।

লুইস নেভেস বলেন, ‘অতএব আইন মানার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা একটি ছোট সংখ্যালঘু গোষ্ঠী পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না।’ তিনি স্বীকার করেন যে সাধারণত পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়, তবে ‘রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দেওয়া যাবে না।

তিনি আরও জানান, নাগরিক সমাজের কথা শুনতে এবং এসব দাবির যৌক্তিক সমাধান খুঁজতে সরকার পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল এবং এখনো রয়েছে।মন্ত্রী বলেন, ‘আবাসন সংকট নামক এই অভিশাপ মোকাবিলার জন্য নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা করতে গৃহায়নবিষয়ক স্টেট সেক্রেটারি এবং পুরো সরকার সুসংগঠিতভাবে প্রস্তুত রয়েছে। এখন জনগণের পক্ষ থেকেই এমন বৈঠকের অনুরোধ জানাতে হবে।

দুই শহরে এই পুলিশি অভিযানের নির্দেশ কে দিয়েছিল জানতে চাইলে লুইস নেভেস বলেন, ‘একটি দেশে পুলিশকে আইন প্রয়োগ করতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হবে—এমনটি ভাবাই যায় না।’ তিনি স্পষ্ট করেন যে, আইন কার্যকরের ক্ষেত্রে পিএসপির পূর্ণ কারিগরি, কৌশলগত ও পরিচালনাগত স্বাধীনতা রয়েছে।পুলিশের ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে তিনি আহত পুলিশ সদস্য ও বিক্ষোভকারীদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন।

তবে মন্ত্রীর এসব বক্তব্য বামপন্থি রাজনীতিবিদদের ক্ষোভ কমাতে পারেনি। আজ ভোরের দিকে লিসবন ও পোর্তোয় তৃতীয়বারের মতো পুলিশের এমন সহিংস অভিযানের দৃশ্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তারা।বামপন্থি দল ‘লিভ্রে’ (LIVRE) পুলিশি হস্তক্ষেপের রাজনৈতিক দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুইস নেভেসের সরাসরি পদত্যাগ দাবি করেছে। দলটির মতে, পুলিশের এই পদক্ষেপ ছিল ‘অসংগতিপূর্ণ ও অযৌক্তিক।

এক বিবৃতিতে লিভ্রে জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে ইউরোপীয় কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার মাইকেল ও’ফ্ল্যাহার্টি এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করবে। দলটির মতে, পুলিশের এই আচরণ ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বিবৃতিতে তারা আবাসন অধিকারের দাবিতে চলা ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে’ পুলিশের এমন সহিংস বলপ্রয়োগকে ‘চরম উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছে।লিভ্রে উল্লেখ করেছে, ‘হাজার হাজার মানুষ যখন একটি তীব্র আবাসন সংকটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে এবং প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্তেনেগ্রোর কাছ থেকে কোনো সমাধান পাচ্ছে না, তখন বারবার এমন সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

দলটি স্পষ্ট ভাষায় জানায়, ‘শালীন ও উপযুক্ত বাসস্থানের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন গণতন্ত্রের জন্য কোনো হুমকি নয়; বরং এটি একটি মৌলিক অধিকারের চর্চা এবং রাষ্ট্রের কাছে তার দায়িত্ব পালনের স্পষ্ট দাবি।’

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version