পর্তুগালের বিচার বিভাগীয় পুলিশ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় একটি আন্তর্জাতিক অবৈধ অভিবাসন নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়েছে। “অপারেশন গামবের্রিয়া” নামে এই অভিযানে বাংলাদেশ ও নেপালের অভিবাসীদের টার্গেট করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বিচার বিভাগীয় পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্ত চক্রটি বাংলাদেশি ও নেপালি নাগরিকদের কাছে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ ইউরো লিগ্যালাইজেশন প্যাকেজ (পর্যন্ত বৈধভাবে থাকা, কাজ করা এবং সরকারি সেবা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র) বিক্রি করত। এই প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত ছিল, ভুয়া বা জাল কাজের চুক্তিপত্র, ট্যাক্স নম্বর, সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (SNS) ব্যবহার করার অনুমতি, ঠিকানার সার্টিফিকেট, ডকুমেন্ট অনুবাদ, এবং বৈধতা প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় আরও বেশ কিছু নথি।
এগুলো দেখিয়ে গ্রাহকদের আশ্বাস দেওয়া হতো যে, তারা দ্রুত পর্তুগালে বৈধভাবে থাকতে এবং কাজ করতে পারবেন।
বিচার বিভাগীয় পুলিশের ধারণা, অবৈধ অভিবাসন নেটওয়ার্কের কোইম্ব্রা শহর শাখা একাই গত তিন বছরে প্রায় ১৮,০০০ অভিবাসীর বৈধতা প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল। এই সংখ্যা পর্তুগালের জন্য নজিরবিহীন এবং দেশের অভিবাসন ব্যবস্থার সুরক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, ভাষাগত সমস্যা, জটিল ভিসা পরিস্থিতি এবং স্থানীয় যোগাযোগের অভাব। এই কারণে বাংলাদেশ ও নেপালের নাগরিকদের বেশি টাকা দেওয়ার জন্য বাধ্য করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, এদের অনেকেই ঋণ করে টাকা জোগাড় করেন এবং পর্তুগালে এসে কঠোর পরিশ্রম করে উচ্চ সুদের সেই ঋণ শোধ করেন। অন্যদিকে ব্রাজিল ও আফ্রিকার দেশগুলোর নাগরিকদের কাছ থেকে তুলনামূলক কম ফি নেওয়া হতো কারণ তাদের ভিসা প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ এবং পর্তুগিজ ভাষায় দক্ষতা বেশি।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, নেটওয়ার্কটির অন্যতম শক্তি ছিল সরকারি ব্যবস্থার ভেতরে থাকা সহযোগীরা।
ওভারের দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র–এর দুই নারী প্রশাসনিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ১০,০০০–এর বেশি অভিবাসীর নাম বেআইনিভাবে পর্তুগালের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার নিবন্ধন করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে একই ঠিকানায় শত শত মানুষের নাম রেজিস্টার করা হয়েছিল, অর্থের বিনিময়ে এসব নথি সহজে অনুমোদন দেওয়া হতো। এসএনএস নম্বর পাওয়া মানে একজন অভিবাসীকে দেশে বসবাসকারী নাগরিকের মতো স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ, যা রেসিডেন্স পারমিট পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
“অপারেশন গামবের্রিয়া”-তে এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার ও ২৬ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অভিবাসন সহায়তা, নথি জালিয়াতি, সরকারি দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং, ও অপরাধী চক্র পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিচার বিভাগীয় পুলিশ জানিয়েছে, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কোটি কোটি ইউরো প্রবাহিত হয়েছে এবং বহু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গাড়ি ও সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
এই নেটওয়ার্কের শিকার হওয়া অনেক অভিবাসী বলেছেন, প্যাকেজের অর্থ জোগাতে তারা, উচ্চ সুদের ব্যক্তিগত ঋণ, আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার, বা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বন্ধকি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পর্তুগালে এসে তারা মাসের পর মাস অতিরিক্ত সময় কাজ করে সেই ঋণ শোধ করেছেন, এমনকি কেউ কেউ দালালদের নিয়ন্ত্রণে বাধ্যতামূলক কাজেও যুক্ত ছিলেন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের বৃহৎ জালিয়াতি অভিবাসন প্রক্রিয়ার প্রতি জনসাধারণের আস্থা কমায়। প্রকৃত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে, এবং প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ থাকা সত্ত্বেও অনেক অভিবাসী অযথা সিস্টেমে ভোগান্তিতে পড়েন।
এদিকে, পর্তুগালের সরকার বলেছে, অভিবাসন নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে আরও বৃহৎ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
