বুধবার, ৭ই অক্টোবর, ২০২৬   |   ২২শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পর্তুগালের কোচ জর্জ জেসুসের বিরুদ্ধে কথা না রাখা এবং জাতীয় দল থেকে তার আকস্মিক বিদায় নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ করেছেন দলের তারকা ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে পর্তুগালের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এবং পরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ১ হাজার ৭৪০ শব্দের দীর্ঘ বিবৃতিতে এসব অভিযোগ করেন ৪১ বছর বয়সী রোনালদো।

গত সপ্তাহে চারটি নেশনস লিগ ম্যাচের মাঝপথে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনায় সতীর্থ ও সমর্থকদের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।

রোনালদোর দাবি, ২৭ সেপ্টেম্বর নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তাকে ৩০ মিনিট খেলানোর কথা বলেছিলেন জেসুস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে মাঠে নামানো হয়নি। এরপর ৪৮ ঘণ্টা পর সংবাদ সম্মেলনে ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষের সম্মতিতে যে বিবরণ দেওয়ার কথা ছিল, জেসুস সেটিও রাখেননি।

রোনালদো বলেন, এসব কারণেই তিনি জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তবে জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছেন না বলে স্পষ্ট করেছেন রোনালদো। বরং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষদিকে ‘এক বা একাধিক বিদায়ী ম্যাচ’ খেলার আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

বিরোধের শুরু

বিশ্বকাপের পর রবার্তো মার্তিনেজের বিদায়ের পর জর্জ জেসুসকে পর্তুগালের কোচ করার সিদ্ধান্তকে তিনি সমর্থন করেছিলেন বলে জানান রোনালদো। সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল নাসরের ক্রীড়া পরিচালক সিমাও কুতিনিও ও জেসুসের সঙ্গে গ্রীষ্মে তার বৈঠকও হয়েছিল।

রোনালদোর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে চারটি নেশনস লিগ ম্যাচ নিয়ে তার জন্য একটি পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওয়েলসের বিপক্ষে ২৪ সেপ্টেম্বর এবং নরওয়ের বিপক্ষে ৪ অক্টোবর তার খেলার কথা ছিল। অন্যদিকে নরওয়ের বিপক্ষে ২৭ সেপ্টেম্বর ও ডেনমার্কের বিপক্ষে ১ অক্টোবর ম্যাচ দুটিতে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তাকে।

কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে দলের সঙ্গে না থাকাটা ‘ভালো দেখাবে না’ মনে করে ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন রোনালদো।

এরপর নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের দিন দুপুরে জেসুস তাকে জানান, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সেদিন রাতে ৩০ মিনিট খেলাবেন তাকে। শারীরিক পুনরুদ্ধার ও অনুশীলনের পরিকল্পনার বাইরে হলেও রোনালদো তাতে রাজি হন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঞ্চেই বসে থাকেন তিনি।

রোনালদোর ভাষায়, ‘হেড কোচ তার কথা রাখেননি।’

ম্যাচের পর সমর্থকদের অভিবাদন জানাতে না যাওয়ার জন্যও ক্ষমা চান তিনি।

‘সেখানে যারা আমাদের সমর্থন করেছেন, সেই পর্তুগিজ জনগণের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চাইছি। আর যারা পর্তুগিজ নন, কিন্তু আমাকে দেখতে সেখানে গিয়েছিলেন এবং যাদের হয়তো আমি হতাশ করেছি, তাদের কাছেও ক্ষমা চাইছি,’ বলেন রোনালদো।

জেসুসের সঙ্গে দ্বিতীয় বৈঠক

নরওয়ের ম্যাচের ৪৮ ঘণ্টা পর জেসুস ও কুতিনিওর সঙ্গে আবার বৈঠকে বসেন রোনালদো। তার দাবি, বৈঠকটি ছিল ‘গভীর, অত্যন্ত খোলামেলা এবং কোনো ধরনের রাখঢাকহীন’।

রোনালদোর ভাষ্য, বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় সংবাদ সম্মেলনে জেসুস বিষয়টি নিয়ে সত্যি কথা বলবেন। সেখানে বলা হবে—রোনালদো কখনো নির্দিষ্ট করে কত মিনিট খেলতে চান তা বলেননি, তাকে খেলানোর পরিকল্পনা জেসুস নিজেই করেছিলেন এবং ওয়ার্ম আপ করিয়ে শেষ পর্যন্ত মাঠে না নামানোটা ছিল জেসুসের ভুল।

এমনকি সংবাদ সম্মেলনে জেসুস কী বলবেন, তা নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত নোটও তৈরি করা হয়েছিল বলে জানান রোনালদো। তিনি নোটটি দেখে সম্মতি দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন।

তবে সংবাদ সম্মেলনে জেসুসের বক্তব্য ছিল ভিন্ন।

রোনালদোর দাবি, জেসুসের বক্তব্য ছিল ‘আক্রমণাত্মক’ ও ‘দম্ভপূর্ণ’। এতে হতাশ হয়ে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

‘মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সত্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যতই কষ্ট হোক, তারা যেন আমাকে সত্যিটা বলে,’ বলেন রোনালদো।

জেসুস বলেছিলেন, ‘কোনো সমস্যা নেই’

নরওয়ের ম্যাচের পর জেসুস জানিয়েছিলেন, রোনালদোকে মাঠে নামানোর জন্য সময়টা সঠিক ছিল না। ম্যাচের পরিস্থিতির কারণে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিলেন বলেও জানান তিনি।

পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জেসুস দাবি করেন, রোনালদোকে নরওয়ে ও ডেনমার্কের বিপক্ষে খেলানো হবে না—এ কথা আগেই জানিয়েছিলেন তিনি। টানা তিন দিন পরপর ম্যাচ খেললে রোনালদোর সমস্যা হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন জেসুস।

তবে রোনালদোর সঙ্গে তার ‘কোনো সমস্যা নেই’ বলে জোর দিয়ে জানান তিনি।

এদিকে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের (এফপিএফ) সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসা বিষয়টিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

পর্তুগালের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরটিপি নোটিসিয়াকে তিনি বলেন, চারটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সময় নিয়ে জেসুস, রোনালদো ও ফেডারেশন বসে সমস্যাটির সমাধান করবে।

প্রোয়েনসা আরও বলেন, রোনালদো জাতীয় দলের অংশ এবং কোচ প্রয়োজন মনে করলে তিনি দলের হয়ে মাঠে নামতে প্রস্তুত থাকবেন।

অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েও পরিবর্তন

বিবৃতিতে রোনালদো জানান, আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে একটি চিঠিও লিখেছিলেন তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে বিমানে এফপিএফ সভাপতি প্রোয়েনসা তাকে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে রাজি করান।

জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে আগেভাগে চলে যাওয়ার ঘটনায় যে শাস্তিই দেওয়া হোক, তা মেনে নেবেন বলেও জানান তিনি।

প্রায় ২৫ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে কোনো কোচের টেকনিক্যাল বা কৌশলগত সিদ্ধান্তে কখনো হস্তক্ষেপ করেননি বলেও দাবি করেন রোনালদো।

‘ভালো হোক বা খারাপ, তারা আমাকে যা করতে বলেন, আমি তা মেনে নিই। আমি তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। তবে তারা যখন আমাকে দেওয়া কথা না রাখেন, তখন আমার মনে হয়, সেখানে আমার আর কোনো জায়গা নেই,’ বলেন তিনি।

জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনাও খোলা রেখেছেন রোনালদো। তিনি বলেন, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলে এবং ক্লাবের হয়ে খেলা চালিয়ে যেতে পারলে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর পর্তুগালের হয়ে আবারও খেলতে ও জিততে প্রস্তুত তিনি।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ উপলক্ষে ‘এক বা একাধিক বিদায়ী ম্যাচ’ খেলারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রোনালদো।

‘আমি আমার সব ভক্তকে এবং অবশ্যই সব পর্তুগিজ মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিতে পারি, আমাদের এক বা একাধিক বিদায়ী ম্যাচ হবে; এর জন্য সময় পাওয়া যাবে,’ বলেন তিনি।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version