ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর পরিচালনা করা পর্তুগালের তৈরি একটি বিরল ড্রোন ভূপাতিত করেছে রুশ বাহিনী। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা টাস জানিয়েছে, তারা এই ‘বিরল’ মডেলের ড্রোনটি নিয়ে গবেষণা করবে এবং এটি ইতিমধ্যে একটি গবেষণা ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।
রুশ অ্যান্টি-ড্রোন ব্যাটালিয়নের কমান্ডারের বরাত দিয়ে টাস জানিয়েছে, ইউক্রেন সীমান্তের ব্রায়ানস্ক অঞ্চলে পর্তুগালের তৈরি ‘টেকেভার এআর৩’ মডেলের ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়।
ব্যাটালিয়ন কমান্ডার বলেন, ‘শত্রুপক্ষের একটি নজরদারি ড্রোন আমাদের এলাকায় প্রবেশ করেছিল। আমরা এটি দেখে অবাক হয়েছিলাম কারণ এর আগে আমরা কখনো এমন কোনো ড্রোন দেখিনি। এই চালকবিহীন আকাশযানটির (ইউএভি) লেজ এবং ডানার গঠন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা যখন দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছালাম, তখন দেখতে পাই এটি পর্তুগালের তৈরি একটি নজরদারি ড্রোন। এ ধরনের নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ প্রথমত, এগুলো শত্রু ড্রোনের ওড়ার রুট বা পথ নির্ধারণ করে এবং দ্বিতীয়ত, এগুলো আমাদের অবস্থান শনাক্ত করে যাতে পরবর্তীতে আমাদের ওপর হামলা চালানো যায়।’
রুশ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার (যারা প্রতিরোধকারী ড্রোন ‘লিস’ বা পোর্তুগিজ ভাষায় ‘শেয়াল’ পরিচালনা করে) টাস-কে জানিয়েছেন, টেকেভার এআর৩ ড্রোনটি ভূপাতিত করার পর তা প্রায় আস্ত অবস্থায় নিচে পড়ে যায়। যদিও এর ‘ইঞ্জিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল’, তবে ‘এর ফুসেলেজ (মূল বডি) এবং এয়ারফ্রেমের বেশিরভাগ অংশ অক্ষত ছিল’।
এই কারণে এবং এটি একটি ‘বিরল’ মডেলের ড্রোন বুঝতে পারার পর, ইউএভি-টি একটি গবেষণা ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়েছে। টাস-এর তথ্য অনুযায়ী, রুশ বিশেষজ্ঞরা এই ড্রোনের ডিজাইন এবং এর প্রযুক্তিগত ও প্রকৌশলগত বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে গবেষণা করবেন।
পর্তুগালের টেকেভার কোম্পানির তৈরি এআর৩ মডেলের এই ড্রোনটির ডানার বিস্তার প্রায় ৪ মিটার, ওজন মাত্র ২৫ কেজি, এর ক্রুজিং গতিবেগ ঘণ্টায় ৭৫ থেকে ৯০ কিলোমিটার এবং এর যোগাযোগ বা সিগন্যাল পরিসীমা ২৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
ইউরোনিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টেকেভারের সিইও রিকার্ডো মেন্ডেস এই ড্রোনগুলোকে প্রকৃত ‘পাখাসহ কম্পিউটার’ বলে অভিহিত করেছেন। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিটি ইউক্রেনে ড্রোন রপ্তানিকারক বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালে এই রপ্তানি থেকে কোম্পানিটির লাভ হয়েছিল ৮ কোটি ৫০ লাখ (৮৫ মিলিয়ন) ইউরোরও বেশি। কোম্পানির তৈরি এই চালকবিহীন আকাশযানগুলো পর্তুগাল ও ইউক্রেনের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করতে সাহায্য করেছে, যার ফলে মাত্র ছয় বছরে পর্তুগালের জাতীয় রপ্তানি র্যাংকিয়ে ইউক্রেন ৭৫তম স্থান থেকে ৩৬তম স্থানে উঠে এসেছে।
সীমান্তের কাছাকাছি এই ড্রোনটি প্রতিরোধ করাকে রুশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত ‘চ্যালেঞ্জিং’ বলে বর্ণনা করেছে।
সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাডারে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার পর প্রতিরোধকারী ড্রোন ‘লিস’ প্রায় ৩০ মিনিট ধরে এটিকে ধাওয়া করে।
রুশ সেনারা বলেন, ‘এআর৩ ড্রোনটি ঘণ্টায় ৯০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গতিতে প্রায় আড়াই (২.৫) কিলোমিটার উচ্চতায় বৃত্তাকারে উড়ছিল, যা লিস ড্রোনটিকে এর কাছাকাছি পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছিল। ধাওয়ার শেষ মুহূর্তে লিস ড্রোনের ব্যাটারি শেষ হয়ে আসছিল, কিন্তু তারপরও ক্রু সদস্যরা পর্তুগিজ নজরদারি ড্রোনটিকে ধরে ফেলে এবং ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।’
মস্কোতে তৈরি ‘লিস’ মূলত আকাশপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য বিশেষায়িত একটি ড্রোন। ছোট ও ফিক্সড-উইং বিশিষ্ট এই ইউএভি-টি প্রায় ১ কেজি ওজনের ওয়ারহেড (বিস্ফোরক) এবং একটি স্বয়ংক্রিয় লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ সিস্টেম দ্বারা সজ্জিত। রাডারে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত হওয়ার পর এটি ট্র্যাকিং বা ধাওয়া করার জন্য উৎক্ষেপণ করা হয় এবং শত্রু ড্রোনের পেছনে লক করার পরপরই এটি বিস্ফোরক চার্জ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে লক্ষ্যবস্তুটিকে ধ্বংস করে দেয়।
ইউরোনিউজ
