বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্পেনে আশ্রয়প্রত্যাশীদের সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। স্প্যানিশ শরণার্থী কমিশন (সিইএআর)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশটিতে এখনো কমপক্ষে ২ লাখ ১৮ হাজার ৭৩১টি আশ্রয় আবেদন বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। সরকার নতুন অভিবাসন আইনের মাধ্যমে নিয়মিতকরণের বড় সুযোগের কথা বললেও বাস্তবে আশ্রয় প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রত্যাখ্যানের হার বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

অভিবাসন ব্যবস্থায় ‘রেজোলিউশন’ বলতে বোঝায় কোনো অভিবাসী বা আশ্রয়প্রার্থীর আইনি অবস্থার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। এর মাধ্যমে কেউ অনিয়মিত অবস্থা থেকে নিয়মিত মর্যাদা পেতে পারেন অথবা আশ্রয়ের দাবির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়, অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান। এই প্রক্রিয়া শুধু ব্যক্তিগত মামলার জন্যই নয়, বরং একটি দেশের সামগ্রিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

সিইএআর-এর ‘সংখ্যার চেয়েও বেশি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে স্পেনে আশ্রয় সংক্রান্ত রেজোলিউশনের সংখ্যা ৬৭ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৬৩-এ পৌঁছেছে, যা ১৯৯২ সালের পর সর্বোচ্চ। তবে এত রেজোলিউশন হওয়া সত্ত্বেও বিচারাধীন মামলার সংখ্যা আশানুরূপভাবে কমেনি। সিইএআর জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় বিচারাধীন আবেদন সামান্য কমলেও তা এখনো উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়ে গেছে।

সিইএআর-এর মতে, ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, পেরু, সেনেগাল, মালি ও বুরকিনা ফাসোর নাগরিকদের আশ্রয় আবেদনে অটোমেটেড বা গোষ্ঠীভিত্তিক সিদ্ধান্তের প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে প্রতিটি আবেদন ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কমিশনের সতর্কবার্তার অর্থ হতে পারে, নিজ দেশে গুরুতর নির্যাতন, সহিংসতা বা হুমকির মুখে থাকা অনেক আবেদনকারীও স্পেনে আশ্রয় মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আশ্রয় অনুমোদনের হার ৭ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। ২০২৪ সালে অনুমোদনের হার ছিল ১৮.৫ শতাংশ আর ২০২৫ সালে তা আরও নেমে গেছে। সিইএআর উল্লেখ করেছে, আশ্রয় অধিকার স্বীকৃতির ক্ষেত্রে স্পেন ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে প্রায় শেষের দিকে অবস্থান করছে। অন্যদিকে, নেতিবাচক সিদ্ধান্তের হার ৭৭ শতাংশ বেড়ে মোট ৪২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আশ্রয়প্রত্যাশীদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।

২০২৫ সালে স্পেনে নতুন আশ্রয় আবেদন সামগ্রিকভাবে ১৪ শতাংশ কমেছে। সিইএআর মনে করছে, এর পেছনে অভিবাসন বিধিমালার সাম্প্রতিক সংস্কার বড় ভূমিকা রেখেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যাদের আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যান হয়েছে, তারা শাস্তির মুখে পড়তে পারেন, এ আশঙ্কায় অনেকেই আবেদন করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

তবে সামগ্রিকভাবে আবেদন কমলেও কিছু দেশের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। ভেনিজুয়েলার নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন বেড়েছে ২৯ শতাংশ এবং মালির নাগরিকদের আবেদন বেড়েছে ৫০ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং দেশটির চলমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকট এর অন্যতম কারণ। অন্যদিকে, মালিতে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা ও সংঘাত মানুষকে ইউরোপমুখী হতে বাধ্য করছে।

এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই স্প্যানিশ সরকার প্রায় পাঁচ লাখ অভিবাসীকে নিয়মিতকরণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সিইএআর এটিকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ’ হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে, অনিয়মিত অভিবাসনের চাপ কমবে, আশ্রয় ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত বোঝা হ্রাস পাবে এবং প্রকৃত আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

তবে কমিশন সতর্ক করে বলেছে, শুধু নিয়মিতকরণ নয়, ন্যায্য, স্বচ্ছ ও ব্যক্তি-কেন্দ্রিক আশ্রয় মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত সমাধান।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version