শনিবার, ৭ই মার্চ, ২০২৬   |   ২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইরানের চলমান পরিস্থিতি এবং নারী অধিকারের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কোনো দেশের নারী অধিকার রক্ষা বা স্বাধীনতার বিষয়টি কখনোই অন্য কোনো রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য যুদ্ধ শুরুর ‘অজুহাত’ হতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় সানচেজ নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, যদি আমরা সত্যিই ইরানি নারীদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, তবে তার সমাধান কখনোই সহিংসতা বা বোমা বর্ষণ হতে পারে না; বরং এর জন্য প্রয়োজন জোরালো কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং সরাসরি সমর্থন।

সানচেজের এই অবস্থানকে অনেকেই ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রতি নমনীয়তা হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন, যা তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, একটি ঘৃণ্য বা দমনমূলক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং একই সাথে একটি অন্যায্য ও বিপজ্জনক সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করা—এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বুঝতে না পারা বা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়াকে তিনি ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, যুদ্ধের বিরোধিতা করা মানেই তেহরানের প্রতি সমমর্মিতা নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানোর মানবিক প্রচেষ্টা।

ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সানচেজের এই কণ্ঠস্বর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে ইউরোপের অনেক প্রভাবশালী দেশ ও নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন করছেন, সেখানে সানচেজ একে ‘আত্মঘাতী বশ্যতা’ হিসেবে দেখছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশেষজ্ঞ আলবার্তো আলেমানোর একটি পর্যবেক্ষণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটন এই যুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক সুফল ভোগ করবে, কিন্তু তার ভয়াবহ খেসারত দিতে হবে ইউরোপকে। জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, শরণার্থী সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার যে ‘বিল’ বা বোঝা তৈরি হবে, তা বহন করার সক্ষমতা ইউরোপের নেই।

এই অনড় অবস্থানের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিলেও সানচেজ নতি স্বীকার করতে রাজি নন। তিনি মনে করেন, স্পেনের মতো একটি মাঝারি শক্তির দেশের এই প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে বিকল্প পথ এখনো খোলা আছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় যারা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন, আজ ইতিহাস তাদেরই সঠিক প্রমাণ করেছে। ইসরায়েল বা আমেরিকার চাপের মুখেও সানচেজের এই অবস্থান তাকে বর্তমান যুদ্ধোন্মাদনার বিশ্বে এক ‘বিবেকের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা কোনো নির্দিষ্ট দেশের পক্ষ না নিয়ে বরং শান্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version