ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য স্পেন ও ইতালির মধ্যে বিরোধ তীব্র হওয়ার মধ্যেই ইতালি থেকে আকাশ ও সমুদ্রপথে আসা যাত্রীদের ওপর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে স্পেন।গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী গতকাল মধ্যরাত থেকে এ নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয়েছে। আগামী এক মাস এটি বহাল থাকবে।ইতালি স্পেনের সঙ্গে একই ধরনের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ চালুর এক সপ্তাহ পর পাল্টা পদক্ষেপ নিল মাদ্রিদ। সম্প্রতি মরক্কো থেকে প্রায় ৭৮ হাজার অভিবাসী স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতায় প্রবেশের পর ইতালি স্পেন সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। এর মধ্যে গত ৩০ জুলাই সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী মরক্কো থেকে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেন।ইতালির এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয় স্পেন।
শুক্রবার মাদ্রিদ রোমকে রোববারের মধ্যে সীমান্ত তল্লাশি ও নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানায়।তবে জবাবে ইতালি জানায়, অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এসব ব্যবস্থা বহাল থাকবে। রোমের আশঙ্কা, ওই সময় সেউতায় অভিবাসীদের নতুন করে ঢল নামতে পারে।সেউতায় অভিবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও ইতালির রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যকার মতবিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে। মেলোনি দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসননীতি আরও কঠোর করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন।
ইতালি ও স্পেনের মধ্যে কোনো স্থলসীমান্ত নেই। তারপরও ইতালির সরকার গত সপ্তাহে সাময়িকভাবে শেনজেন অঞ্চলের অবাধ চলাচল স্থগিতের ঘোষণা দেয়, যাতে সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের কেউ ইতালিতে যেতে না পারেন।
স্পেনের বক্তব্য, সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশের সুযোগ নেই। ফলে ইতালির এই সিদ্ধান্তের পেছনে বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। মাদ্রিদ রোমের যুক্তিকে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
শুক্রবারের সতর্কবার্তার জবাবে ইতালি জানায়, তারা কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে চলবে না। স্পেন থেকে আসা তৃতীয় দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে শেনজেন চুক্তির প্রয়োগ স্থগিতের সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনা করবে না রোম।
ইতালির সরকার জানিয়েছে, দেশটির নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত ঝুঁকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত, অথবা অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এ ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
ইতালীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সীমান্ত তল্লাশিতে নিয়োজিত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ স্পেন ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে স্পেন হয়ে ইতালিতে আসা যাত্রীদের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে ‘সম্ভব সবকিছু’ করছে।
ইতালি আরও জানিয়েছে, দেশটিতে প্রবেশের সময় স্পেনের নাগরিকদের অতিরিক্ত তল্লাশি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। বাড়তি পরীক্ষা কেবল ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
তবে স্পেনের দৈনিক এল পাইসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কয়েকটি বিমানবন্দরের টার্মিনালে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। স্পেন থেকে আসা যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ লাইনে দাঁড়িয়ে তল্লাশি দিতে হচ্ছে তাদের।
স্পেন সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শুক্রবার নেওয়া পাল্টা পদক্ষেপের আওতায় ইতালি থেকে আসা ইতালীয় নাগরিকসহ অন্যান্য দেশের যাত্রীদের পাসপোর্ট, জাতীয়তা ও ভিসা পরীক্ষা করা হবে। দেশটিতে চলমান অনিয়মিত অভিবাসনের চাপের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মাদ্রিদ।
সরকার আরও জানিয়েছে, নতুন তল্লাশি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চালু থাকবে। তবে যে পরিস্থিতির কারণে এটি কার্যকর করা হয়েছে, তাতে পরিবর্তন এলে সময়সীমাও পরিবর্তন করা হতে পারে।
ইইউর অভিবাসন কমিশনার ম্যাগনুস ব্রুনার বলেছেন, এ ঘটনার পেছনে ভুয়া তথ্য ছড়ানো অপরাধী চক্রের ভূমিকা থাকতে পারে। স্পেন সরকারও এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত।
শেনজেন চুক্তির অধীনে অবাধ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ইতালি এর আগেও স্লোভেনিয়ার সঙ্গে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু রেখেছে।
ইতালির এক মাসের জন্য শেনজেন ব্যবস্থা স্থগিতের সিদ্ধান্তকে ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক সমর্থন করেছে। অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্র স্পেনের শেনজেন সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
গত সপ্তাহে সেউতায় পৌঁছানো অধিকাংশ অভিবাসীকেই কয়েক দিনের মধ্যে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে সেখানে এখনো প্রায় ১ হাজার ৪০০ অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে ছোট শিশুও রয়েছে।
স্পেন অবশ্য মরক্কো থেকে অভিবাসীদের দ্বিতীয় দফায় প্রবেশের কোনো আনুষ্ঠানিক সতর্কতা জারি করেনি। তবে এল পাইসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরক্কো থেকে আবারও সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়ায় নতুন করে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পত্রিকাটিকে জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে গত সপ্তাহের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তারা করছে না।
কেন এত বিপুলসংখ্যক অভিবাসী সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। ইইউর অভিবাসন কমিশনার ম্যাগনুস ব্রুনারের মতে, এর পেছনে ভুয়া তথ্য ছড়ানো বিভিন্ন অপরাধী চক্রের ভূমিকা থাকতে পারে। স্পেন সরকারও একই মূল্যায়ন করেছে।
স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পরই সেউতায় অভিবাসীদের এই প্রবেশের ঘটনা ঘটে। ওই রায়ে বলা হয়, সেউতা বা মেলিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টার সময় সমুদ্রে আটক অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না।
অন্যদিকে মরক্কো এই সংকটের জন্য আদালতের ওই রায়কেই দায়ী করেছে। দেশটির সরকারের একটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেছে, অপরাধী চক্রের কারণে নয়, বরং আদালতের রায়ের ফলে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং এর সুযোগেই অভিবাসীদের ঢল নেমেছে।
একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ সাঁতার কেটে সেউতায় যাওয়ার চেষ্টা করায় প্রশ্ন উঠেছে, মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা কেন তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেনি।
সেউতা ও মেলিয়া—স্পেনের এই দুটি ছিটমহল দীর্ঘদিন ধরেই স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধের অন্যতম কারণ। অঞ্চল দুটির ওপর স্পেনের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয় না মরক্কো।
