সোমবার, ১লা জুন, ২০২৬   |   ১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১লা জুন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেদ্রো সানচেজের মেয়াদের ঠিক আট বছর পূর্ণ হবে।তবে এই দীর্ঘ শাসনকালের পূর্তিতে কোনো উদযাপনের আমেজ নেই, বরং চারপাশের একের পর এক গুরুতর দুর্নীতির তদন্তে সরকার ও শাসক দল সোশ্যালিস্ট পার্টি জর্জরিত হওয়ায় তিনি এখন নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে সরাসরি কোনো তদন্তে জড়িত না থাকলেও তার পরিবারের সদস্য ও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্ররা বড় ধরনের কেলেঙ্কারির মুখে পড়েছেন। এর ফলে স্পেনের মধ্য-ডানপন্থী বিরোধী দলগুলো তার পদত্যাগ এবং আগাম সাধারণ নির্বাচন ডাকার জোর দাবি জানিয়েছে।

দুর্নীতির এই জাল প্রধানমন্ত্রীর একদম নিজের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তাঁর সংগীতশিল্পী ভাই ডেভিড কোনো রকম বাছাই প্রক্রিয়া ছাড়াই দক্ষিণ-পশ্চিম স্পেনের বাদাজোজে একটি বড় পদে নিয়োগ পাওয়া এবং পরবর্তীতে দায়িত্ব পালন না করে প্রভাব খাটানোর অভিযোগে সম্প্রতি বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন। অন্যদিকে, ২০২৪ সাল থেকে একজন বিচারক প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী বেগোনিয়া গোমেজের ব্যবসায়িক বিষয়াদি তদন্ত করছেন। তহবিলের অপব্যবহার ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগে তার স্ত্রীর বিচারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং আগামী ৯ই জুন তাকে প্রাথমিক শুনানির জন্য আদালতে তলব করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ অবশ্য তার ভাই ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে আনা এই মামলাগুলোর তীব্র সমালোচনা করে একে উগ্র ডানপন্থী সংগঠনগুলোর অন্ধকার চক্রান্ত বলে উল্লেখ করেছেন।

পারিবারিক সংকটের পাশাপাশি সানচেজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীদের কর্মকাণ্ডও তাকে বেশ কোণঠাসা করে ফেলেছে। স্পেনের প্রাক্তন সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী এবং সানচেজের নৈতিক আদর্শ হিসেবে পরিচিত হোসে লুইস রদ্রিগেজ জাপাতেরোর নাম এবার অর্থ পাচারের অভিযোগে একটি তদন্তে উঠে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ২০২১ সালে একটি এয়ারলাইনকে ৫৩ মিলিয়ন ইউরোর সরকারি তহবিল পাইয়ে দিতে নিজের প্রভাব খাটিয়েছেন এবং মোটা অঙ্কের কমিশন নিয়েছেন। এই মামলার জেরে আগামী ১৭ই জুন তাকে আদালতে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হবে। এর আগে ২০২৩ সাল থেকেই দলের প্রাক্তন পরিবহন মন্ত্রী হোসে লুইস আবালোস এবং শীর্ষ নেতা সান্তোস সের্দানের বিরুদ্ধে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় ফেস মাস্ক বিক্রি থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ইউরো ঘুষ গ্রহণের একটি মামলার বিচার চলছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন স্প্যানিশ পুলিশ আদালতের আদেশে মাদ্রিদে সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রধান কার্যালয়ে টানা ১২ ঘণ্টা ব্যাপী এক বিশাল অভিযান পরিচালনা করে। অভিযোগ উঠেছে, দলটি তাদের একজন সদস্যকে অর্থ প্রদান করেছিল যাতে তিনি চলমান দুর্নীতি মামলার তদন্তকারী পুলিশ, বিচারক এবং প্রসিকিউটরদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য একটি গোপন অপপ্রচারণা চালান। বিরোধীরা এই ঘটনাকে ‘সোশ্যালিস্টদের ওয়াটারগেট’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে বর্তমান সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল মধ্য-বামপন্থী সংবাদপত্র ‘এল পাইস’ অত্যন্ত কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছে যে, মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি এটা স্পষ্ট করে দেয় যে এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা অন্ধকার ষড়যন্ত্রের ফল নয়, বরং এই তদন্তগুলো সরাসরি গত আট বছর ধরে শাসন করে আসা ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দুর সাথে যুক্ত।

এই চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও চারপাশের কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও নিজের দৃঢ়তার জন্য পরিচিত প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি সংসদে তাঁর সম্পূর্ণ আইন প্রণয়নকাল শেষ না করে পদত্যাগ করবেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে এই মুহূর্তে সানচেজ সরকারকে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে হঠানোর মতো পর্যাপ্ত সমর্থন বিরোধী দলগুলোর কাছে নেই, কারণ কিছু আঞ্চলিক দল উগ্র-ডানপন্থী দলগুলোর ক্ষমতায় আসার ভয়ে সানচেজ সরকারকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। জনমত বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আসন্ন গ্রীষ্মকালীন ছুটি এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে সাময়িকভাবে কিছুটা শান্ত করতে পারে, যা আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ শাসক দলকে আবার নতুন করে রাজনৈতিক উদ্যোগ পুনরুদ্ধারের সুযোগ করে দেবে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি 

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version