রাজধানী মাদ্রিদে ৮৭ বছর বয়সী এক নারীকে জোর করে বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনায় ব্যাপক বিক্ষোভের পর নতুন আবাসন নীতিমালা অনুমোদন করেছে স্পেনের জোট সরকার। নতুন নীতিমালায় সাধারণ ভাড়াটিয়াদের ২০৩০ সাল পর্যন্ত উচ্ছেদে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ-সংক্রান্ত দুটি জরুরি ডিক্রি অনুমোদন দেওয়া হয়। আদেশ দুটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে। তবে আগামী এক মাসের মধ্যে এগুলো পার্লামেন্টে অনুমোদন করাতে হবে। সংখ্যালঘু প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সরকারের জন্য বিরোধী দলগুলোর সমর্থন পাওয়া এ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত উচ্ছেদে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান ভাড়ার চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা ‘ভালচার ফান্ড’-এর আবাসিক সম্পত্তি কেনায় নিষেধাজ্ঞা এবং স্বল্পমেয়াদি ও কক্ষভাড়া নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর বিধিনিষেধের প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোনিকা গার্সিয়া বলেন, নতুন পদক্ষেপে ৫০ লাখের বেশি মানুষ উপকৃত হবেন। তিনি বলেন, ‘ফটকাবাজ আবাসন বাজারে এখনই হস্তক্ষেপ করার এবং সাধারণ নাগরিক ও ভালচার ফান্ডের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির সময় এসেছে।’
আন্দোলনকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের অবস্থান ও বিক্ষোভ ছাড়া এটি সম্ভব হতো না।’
তবে সরকারের উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে মধ্য-ডানপন্থী দল জুনতস। দলটির মুখপাত্র মিরিয়াম নোগুয়েরাস বলেন, বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন সম্পত্তি থেকে কাউকে উচ্ছেদ বন্ধ করার বিষয়ে তাদের আপত্তি নেই। তবে নিজেদের সঞ্চয় দিয়ে একটি ফ্ল্যাট বা ব্যবসায়িক সম্পত্তি কেনা ছোট মালিকদেরও একই নিয়মের আওতায় আনা ঠিক হবে না।
সরকারের নতুন পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে মাদ্রিদে তার বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনা। তাকে স্ট্রেচারে করে জোর করে ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেওয়ার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়।
১৯৫৬ সালে আবাসকালের বাবা ওই বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরও তিনি সেখানেই বসবাস করছিলেন।
২০১৮ সালে ‘উরবাগেস্তিওন’ নামে একটি বিনিয়োগ সংস্থা ভবনটি কিনে নেওয়ার পর আবাসকালের জন্য মাসিক ভাড়া তার পেনশনের চেয়েও বেশি নির্ধারণ করা হয়। তবে সম্প্রতি কোম্পানিটির সঙ্গে সমঝোতা হওয়ায় তিনি আবার ওই বাসায় ফিরতে পারবেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে মাদ্রিদ ছাড়াও বার্সেলোনা, সেভিল, মালাগা ও কাদিজসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সোল চত্বরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা।
আবাসনমন্ত্রী ইসাবেল রদ্রিগেজ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ডিক্রিগুলো সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কংগ্রেসের সুযোগ আছে মারিকারমেনকে বলার যে তার কষ্ট বৃথা যায়নি এবং তার লড়াইয়ে অনেক মানুষ উপকৃত হবে।’
তবে মাদ্রিদ টেন্যান্টস ইউনিয়নের মুখপাত্র ভ্যালেরিয়া রাকু বলেন, তাদের লড়াই ‘মাত্র শুরু হয়েছে’। আগামী সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে আরও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন তিনি।
সংখ্যালঘু সরকার হওয়ায় পার্লামেন্টে ডিক্রিগুলো অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী সানচেজের বিরোধী দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে আবাসন বাজারে ভাড়াটিয়াদের পক্ষে সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়ে ডানপন্থী দলগুলোর আপত্তি থাকায় প্রস্তাবগুলো পাস হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ব্যাংক অব স্পেনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বাড়ি নির্মাণ ও চাহিদার ব্যবধানের কারণে দেশটিতে প্রায় ৭ লাখ বাড়ির ঘাটতি রয়েছে।
জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের (আইএনই) ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে স্পেনে বাড়ির দাম ১২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।
রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান আইডিয়ালিস্তার হিসাবে, ২০২৫ সালে বাড়ির ঘাটতির কারণে দেশটিতে ভাড়ার খরচ ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। মাদ্রিদে এই বৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, স্পেনে সবচেয়ে বেশি ভাড়া দিতে হয় বার্সেলোনা ও মাদ্রিদে। শহর দুটিতে প্রতি বর্গমিটারে মাসিক ভাড়া যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৮০ ও ২২ দশমিক ৭০ ইউরো।
