স্পেনের ছিটমহল সেউতায় মরক্কো সীমান্ত ঘিরে ব্যাপক অনুপ্রবেশের ঘটনায় অন্তত ৬৭ জনের প্রাণহানির পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। শনিবার (১ আগস্ট) রাতজুড়ে নতুন করে বড় ধরনের কোনো অনুপ্রবেশের চেষ্টা হয়নি বলে জানিয়েছে স্পেন। এদিকে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারে প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি ভাসমান প্রতিবন্ধক নির্মাণ শুরু করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
স্পেন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করে। আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একমাত্র স্থল সীমান্তে এটিই ছিল এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় গণ-অনুপ্রবেশের ঘটনা। তবে স্পেনের দাবি, বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে ৪৮ হাজারেরও বেশি মানুষকে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে।
শনিবার রয়টার্সের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন সেউতার সমুদ্রতীরজুড়ে সেনা ও পুলিশ সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। উপকূলের অধিকাংশ অংশই তখন জনশূন্য ছিল।
স্পেন সরকার এক বিবৃতিতে জানায়, শনিবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে সেউতার একটি প্রধান সীমান্তপথে সিভিল গার্ড সদস্যরা ভাসমান নিরাপত্তা বেড়া স্থাপনের কাজ শুরু করেন।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিউমেটিক এই ভাসমান প্রতিবন্ধকের সঙ্গে নোঙর করা বয়ার সারি যুক্ত করা হয়েছে। এগুলো পানির ওপরে ১২ থেকে ২৮ ইঞ্চি পর্যন্ত উঁচু থাকবে এবং পানির নিচে প্রায় এক মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে মাঝখানে একটি নির্ধারিত চ্যানেল রাখা হয়েছে, যাতে সিভিল গার্ডের টহল নৌযান সহজে চলাচল করতে পারে।মরক্কোকে ‘বিশ্বস্ত অংশীদার’ বললেন স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমান্তের বেড়া ও ব্রেকওয়াটার অতিক্রমের সময় অনেকে পানিতে ডুবে এবং পদদলিত হয়ে মারা যান। স্পেনের অংশে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের প্রভাবে বহু মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ এই পথ বেছে নিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা বলেন, মানবপাচারকারী চক্রগুলো অসহায় মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে। পাশাপাশি তারা স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়ের ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, সমুদ্রে আটক অভিবাসীদের ক্ষেত্রে কোনো ভৌত প্রতিবন্ধক না থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, মাত্র একদিনের মধ্যেই পরিস্থিতির ওপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। তবে সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজন যতদিন থাকবে, ততদিন সেনাবাহিনী ও অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রাখা হবে। যদিও গত রাত থেকে অনুপ্রবেশের সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘মরক্কো সেউতা কিংবা স্পেনের অন্য কোনো অঞ্চলের জন্য হুমকি নয়। তারা আমাদের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য অংশীদার।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এত বড় আকারের গণ-অনুপ্রবেশের বিষয়ে আগে থেকে কোনো গোয়েন্দা সতর্কবার্তা ছিল না।সেউতা সংকট নিয়ে জরুরি বৈঠক চায় ইইউর সদস্য দেশগুলো
মরক্কোর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত স্পেনের দুটি ছিটমহল—সেউতা ও মেলিইয়া—দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করা অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য।
সাম্প্রতিক এই গণ-অনুপ্রবেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরেও মতপার্থক্যের সৃষ্টি করেছে। কয়েকটি সদস্য দেশ স্পেনকে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানিয়েছে।
শনিবার ইইউর ২২টি সদস্য রাষ্ট্র সেউতা পরিস্থিতি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক আয়োজনের দাবি জানায়। পাশাপাশি মরক্কো সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় স্পেনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
রয়টার্স
