বৃহস্পতিবার, ১৩ই আগস্ট, ২০২৬   |   ২৯ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গত ৩০ জুলাই স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় হাজার হাজার অভিবাসীর আকস্মিক ও বিপজ্জনক অনুপ্রবেশের পর সেখানে নেওয়া ব্যবস্থার মতো এবার মেলিলা উপকূলেও একটি ভাসমান বেড়া (ফ্লোটিং ব্যারিয়ার) স্থাপন করেছে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

স্পেনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইএফই-র তথ্য অনুযায়ী, মেলিলার দক্ষিণ অংশের স্থল ও সমুদ্র সীমানা হিসেবে ব্যবহৃত একটি ৫০০ মিটার দীর্ঘ পিয়ার বা জেটির শেষ প্রান্তে এই ভাসমান বেড়াটি ইতিমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে, যা শহরটিকে মরক্কোর নাদোর বন্দর থেকে পৃথক করেছে। এই নতুন কাঠামোটি গত সপ্তাহে দক্ষিণ ব্রেকওয়াটারের শেষ অংশে স্থাপন করা অস্থায়ী বেড়ার পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, যা আগে সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল।

সমুদ্রপথে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করা হলে, এই নতুন বেড়াটি সীমান্তে অনুপ্রবেশকারীদের প্রতিহত করা অনেক সহজ করে তুলবে। ইএফই কর্তৃক উদ্ধৃত পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, সাঁতার কেটে সেউতা ও মেলিলা পার হওয়ার চেষ্টা করা কোনো অভিবাসীকে তাৎক্ষণিকভাবে সীমান্ত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া নিষিদ্ধ করে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায়ের ফলেই মূলত এই ভাসমান বেড়াগুলো স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে নিরাপত্তার স্বার্থে এই স্বায়ত্তশাসিত শহরের দক্ষিণ ব্রেকওয়াটার সড়কটিতে যানবাহন ও পথচারী চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষভাগে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৭২,০০০ মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন, যাদের বেশিরভাগই পরবর্তীতে মরক্কোয় ফিরে গেছেন। আজ ইএফই-কে দেওয়া পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মরক্কো থেকে আসা ব্যাপক অনুপ্রবেশের পর বর্তমানে যে ১০,০০০ অভিবাসী সেউতায় অবস্থান করছেন, তাদের মধ্যে ৬০০-রও বেশি মানুষ গত ৪৮ ঘণ্টায় স্বেচ্ছায় শহরটি ছেড়ে চলে গেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ব্যাখ্যা করেছে যে, এই ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে ঘটছে এবং এর অন্যতম কারণ হলো—অভিবাসীরা বুঝতে পেরেছেন যে তাঁরা স্পেনের মূল ভূখণ্ডে ভ্রমণ করতে পারবেন না এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের মরক্কোতেই ফিরে যেতে হবে।

সাঁতার কেটে সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ৮২ জন মারা গেছেন। উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের দুটি ছিটমহল সেউতা এবং মেলিলা মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আফ্রিকান মহাদেশের মধ্যে একমাত্র স্থল সীমান্ত।

সার্বভৌমত্ব ও দখল নিয়ে মরক্কো-স্পেন দ্বন্দ্ব

এই অভিবাসী সংকটের মধ্যেই মরক্কোর সাথে স্পেনের নতুন কূটনৈতিক বিরোধ শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার মরক্কোর বিচারমন্ত্রী আবদেল লতিফ ওয়াহবি প্যান-আরব সম্প্রচারমাধ্যম ‘আশারক নিউজ’-কে বলেছেন, রাবাত সেউতা ও মেলিলার ওপর তাদের ঐতিহাসিক দাবি বজায় রেখেছে এবং যখনই দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসেন, তখনই এই বিষয়টি ‘অমীমাংসিত এবং আলোচনার টেবিলে’ থাকে। তিনি সংলাপের মাধ্যমে তাঁর বিবেচনায় মরক্কোর ভূখণ্ড হওয়া এই অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করার জন্য একটি ‘দীর্ঘমেয়াদি’ কৌশলের কথা উল্লেখ করেছেন।

তবে গত মঙ্গলবার মেলিলা সরকার স্পেনের এই স্বায়ত্তশাসিত শহরগুলোর ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের যুক্তি—এই শহরগুলোর স্প্যানিশ বা হিস্পানিক পরিচয়ের সূচনা হয়েছে প্রায় ৫৩০ বছর আগে, যখন ‘মরক্কো সাম্রাজ্যের কোনো অস্তিত্বই ছিল না এবং এর কোনো প্রত্যাশাও ছিল না।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মেলিলার প্রথম ভাইস-প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল মারিন বলেন, ঐতিহাসিক, আইনি বা রাজনৈতিক কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই ‘সংলাপের মাধ্যমে হোক বা সংলাপ ছাড়া হোক, আলোচনার কোনো সুযোগই নেই।’

মিগুয়েল মারিন বলেন, ‘মেলিলা হলো স্পেন এবং আজ পর্যন্ত যেমনটি হয়ে এসেছে, আগামী শত শত বছর ধরে এটি স্পেনই থাকবে। ১৪৯৭ সাল থেকে ধরলে আমরা প্রায় ৫৩০ বছরের ইতিহাসের কথা বলছি।’ তিনি বড় গলার দাবি বা দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘মেলিলার স্প্যানিশ পরিচয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা সম্পূর্ণ ও চরম অজ্ঞতার পরিচয় দেয়।’

মারিন আরও যোগ করেন, ‘যা দাবি করা ও আলোচনা করা প্রয়োজন তা হলো আমাদের শহরে অবৈধভাবে আসা সমস্ত অভিবাসীকে মরক্কোতে স্থানান্তর করা।’ তিনি এটি ‘যত দ্রুত সম্ভব’ সম্পন্ন করার এবং ‘ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে তা নিশ্চিত করার’ দাবি জানান।

জার্নাল নোটিশিয়াস

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version