চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করলেন স্পেনের চিকিৎসকেরা। বিশ্বে প্রথমবারের মতো স্বেচ্ছামৃত্যু বা ‘অ্যাসিস্টেড ডাইং’-এর মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করা একজন দাতার কাছ থেকে মুখমণ্ডলের টিস্যু প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই জটিল অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হয়েছে বার্সেলোনার বিখ্যাত ভল ডি হেবরন হাসপাতাল-এ।
সোমবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানায়, দাতার মুখের মাঝামাঝি অংশের টিস্যু গ্রহীতার মুখে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই অস্ত্রোপচার ছিল অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল, যেখানে প্রায় ১০০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী অংশ নেন। দলে ছিলেন প্লাস্টিক সার্জন, নিউরোসার্জন, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ইমিউনোলজিস্ট এবং ট্রান্সপ্লান্ট সমন্বয়কারীরা। হাসপাতালের ট্রান্সপ্লান্ট কোঅর্ডিনেটর এলিজাবেথ নাভাস বলেন,
“যিনি নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি শেষ ইচ্ছা হিসেবে একজন অচেনা মানুষকে নতুন জীবন দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এই মানসিক পরিপক্বতা ও মানবিকতা আমাদের সবাইকে বাকরুদ্ধ করেছে।”
তার মতে, স্বেচ্ছামৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দাতা দীর্ঘ মানসিক ও নৈতিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে গেছেন এবং সম্পূর্ণ সচেতনভাবেই অঙ্গ দানের অনুমতি দিয়েছেন।
মুখ প্রতিস্থাপনের গ্রহীতার নাম কারমে। একটি পোকার কামড় থেকে সৃষ্ট মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে (নেক্রোসিস) তার মুখের টিস্যু ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে তার খাওয়া, কথা বলা ও দেখার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সোমবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কারমে বলেন,
“বাড়িতে আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে হয় আমি আবার আগের মতো হয়ে উঠছি। এটা আমার জীবনে নতুন করে বাঁচার সুযোগ।”
চিকিৎসকদের মতে, কারমের শারীরিক উন্নতি আশাব্যঞ্জক এবং ধীরে ধীরে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
চিকিৎসকেরা জানান, মুখ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে রক্তের গ্রুপ, লিঙ্গ এবং মাথার আকারের ঘনিষ্ঠ সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি আজীবন ইমিউনো-সাপ্রেসিভ ওষুধ গ্রহণ করতে হয়, যাতে শরীর নতুন টিস্যুকে প্রত্যাখ্যান না করে। এই অস্ত্রোপচারের আগে গ্রহীতার মানসিক প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নতুন মুখের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া একটি দীর্ঘ ও জটিল মানসিক প্রক্রিয়া।
প্রায় ৫ কোটি জনসংখ্যার দেশ স্পেন তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অঙ্গ প্রতিস্থাপনে বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ২০২১ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চতুর্থ দেশ হিসেবে স্পেন স্বেচ্ছামৃত্যুকে বৈধতা দেয়। এখন পর্যন্ত দেশটিতে মোট ছয়টি মুখ প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে অর্ধেকই করেছে ভল ডি হেবরন হাসপাতাল। ২০১০ সালে বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুখ প্রতিস্থাপন ও করেছিল এই কাতালান হাসপাতালটি। স্পেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশটিতে প্রায় ৬ হাজার ৩০০টি অঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে, যার মধ্যে কিডনি প্রতিস্থাপন ছিল সবচেয়ে বেশি।
গোপনীয়তার স্বার্থে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অস্ত্রোপচারের সুনির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করেনি। তবে রয়টার্সকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, অস্ত্রোপচারটি ২০২৫ সালের শরৎকালে সম্পন্ন হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের নয়, বরং নৈতিকতা, মানবিকতা ও অঙ্গ দানের ধারণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। স্বেচ্ছামৃত্যু ও অঙ্গ প্রতিস্থাপন—এই দুই সংবেদনশীল বিষয়ের সমন্বয় ভবিষ্যতে চিকিৎসা ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
