মরক্কো থেকে আসা হাজার হাজার অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে ছোঁয়াচে রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে উত্তর আফ্রিকার ছিটমহল সেউতায় জরুরি ভিত্তিতে ৪৫,০০০ ডোজ ভ্যাকসিন পাঠাচ্ছে স্পেন সরকার।
স্পেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই জরুরি চালানের মধ্যে হাম, মাম্পস এবং রুবেলা (এমএমআর) প্রতিরোধী ১৫,০০০ ডোজ এবং ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, জলবসন্ত (চিকেনপক্স) ও পোলিও প্রতিরোধী আরও ৩০,০০০ ডোজ ভ্যাকসিন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গত ৩০ ও ৩১ জুলাই মরক্কো সীমান্ত দিয়ে ৭২,০০০-এর বেশি অভিবাসীর নজিরবিহীন গণঅনুপ্রবেশের পর, একটি বিশেষ সংহতি চুক্তির (Solidarity Scheme) অধীনে এই ভ্যাকসিন পাঠানোর বিষয়ে একমত হয়েছে স্পেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও আঞ্চলিক সরকারগুলো।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ভ্যাকসিনগুলো মূলত টিকা না নেওয়া অভিবাসীদের পাশাপাশি সেউতার স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া হবে। কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলেছে যে, এটি সম্পূর্ণ একটি ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ এবং এই মুহূর্তে সেউতায় বড় ধরনের কোনো জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় বা জরুরি অবস্থা নেই।
তবে জুলাইয়ের ওই চরম সংকটের পর থেকে সেউতার চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্পেনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ৩১ জুলাই থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে এই অনুপ্রবেশের সঙ্গে জড়িত ৫,৮০০-র বেশি মানুষকে জরুরি চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রেড ক্রসের একটি বিশেষ মেডিকেল টিম সেউতায় আরও প্রায় ২,৫০০ মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের গাদাগাদি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলাইটিস (সংক্রামক ডায়রিয়া), খোসপাঁচড়া (স্ক্যাবিস), ইম্পেটিগো এবং যক্ষ্মার (টিবি) মতো রোগব্যাধি ছড়াতে শুরু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে, সাধারণ মানুষের চেয়ে এই রোগগুলোর বড় ঝুঁকি মূলত অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে বসবাস করা অভিবাসীদের নিজেদেরই বেশি।
স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া বলেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো—অভিবাসীদের জন্য উপযুক্ত বাসস্থান, বিশুদ্ধ সুপেয় পানি, খাবার এবং মৌলিক স্যানিটেশন বা স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা। এটি করতে পারলেই যেকোনো ধরনের সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এদিকে, এই স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সংক্রান্ত উদ্যোগকে কেন্দ্র করে স্পেনের রাজনীতিতে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ডানপন্থী দল ‘পার্টিডো পপুলার’ (PP)-এর বিরোধী দলীয় নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইহো দাবি করেছেন, যেসব অভিবাসী সংক্রামক রোগে আক্রান্ত, তাদের আলাদা স্থানে অবরুদ্ধ বা কোয়ারেন্টাইনে রাখা উচিত। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই ঢালাও দাবির বিরোধিতা করে বলেছেন, কোনো রোগ কীভাবে ছড়ায় এবং তার প্রকৃতি কেমন, তার ওপর ভিত্তি করেই কেবল সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, এভাবে ঢালাও অবরুদ্ধকরণ বিজ্ঞানসম্মত নয়।
জুলাইয়ের শেষভাগে মরক্কো থেকে বিপজ্জনকভাবে সেউতায় ঢোকার সময় পানিতে ডুবে ও পদদলিত হয়ে ৯০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর পর থেকেই এই অঞ্চলটি নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা চলছে। পরবর্তীতে গত ১৫ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরেকটি গণঅনুপ্রবেশের উসকানি দেওয়া হলেও মরক্কো ও স্পেনের পুলিশ তা কঠোরভাবে প্রতিহত করে।
