বুধবার, ২৬শে আগস্ট, ২০২৬   |   ১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্য থেকে ইংলিশ চ্যানেলের তলদেশের সুড়ঙ্গ (চ্যানেল টানেল) দিয়ে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে যাতায়াতকারী যাত্রীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। এই রুটে নতুন নতুন রেল অপারেটরদের আগমন ও বর্ধিত সক্ষমতার কারণে খুব শীঘ্রই প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর হাইস্পিড বা দ্রুতগতির ট্রেন লন্ডন থেকে প্যারিস, ব্রাসেলস ও আমস্টারডামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে।

বর্তমানে এই রুটে একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে ‘ইউরোস্টার’-এর, যারা প্রতিদিন ২৫টি রাউন্ড ট্রিপ (যাওয়া-আসা) পরিচালনা করে। তবে পলিটিকো-র হিসাব অনুযায়ী, নতুন নতুন কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে এই দশকের শেষ নাগাদ দৈনিক ট্রিপের সংখ্যা বেড়ে ৫৫-তে দাঁড়াবে—অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৪টি ট্রেন লন্ডন থেকে ছেড়ে যাবে।

১৯৯৪ সালে চালুর পর থেকেই চ্যানেল টানেলটি তার পূর্ণ সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম চলেছে। ফলে এর অবকাঠামো মালিকেরা দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোস্টারের একচেটিয়া ব্যবসা ভাঙতে একটি ‘দ্বিতীয় অপারেটর’কে এই রুটে আমন্ত্রণ জানিয়ে আসছিলেন। অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের রেল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘অফিস অব রেল অ্যান্ড রোড’ বিখ্যাত ‘ভার্জিন ট্রেনস’-কে প্রতিদিন ২০টি রাউন্ড ট্রিপ চালানোর প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক ট্রেন চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কয়েকটি অনুমোদনের মধ্যে প্রথম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভার্জিন ২০৩০ সাল থেকে এই সেবা চালু করতে চায়।

রেল নিয়ন্ত্রক সংস্থার ডেপুটি ডিরেক্টর মার্টিন জোন্স বলেন, ‘ভার্জিনকে এই ট্র্যাক ব্যবহারের অধিকার দেওয়া আন্তর্জাতিক রেল সেবার বাজারে প্রতিযোগিতা এবং প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী পদক্ষেপ।’

ইতালির স্টেট রেলওয়ের বড় চ্যালেঞ্জ

এই রুটে ইউরোস্টারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে কেবল ভার্জিন একা আসছে না। ইতালির রাষ্ট্রীয় রেলপথ ‘ট্রেনিতালিয়া’ বুক ফুলিয়ে ঘোষণা করেছে যে, তারা ২০২৯ সালের মধ্যেই এই চ্যানেল রুটে ট্রেন চালানো শুরু করবে। তারা প্রতিদিন ১০টি রাউন্ড ট্রিপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ইতালি কেবল মুখেই বলেনি, ইতিমধ্যে কাজেও তার প্রমাণ দিয়েছে। জাপানি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘হিটাচি’র কাছে ২ বিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে ১৯টি নতুন হাইস্পিড ট্রেনের অর্ডার দিয়েছে ট্রেনিতালিয়া, যার একটি বড় অংশ এই ইংলিশ চ্যানেল টানেলে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হবে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই কোম্পানিটি প্যারিসের দক্ষিণে মেসঁ-আলফোর্ট পম্পাদৌরে ৮০ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে একটি নতুন ডিপো বা ইয়ার্ড নির্মাণ করছে, যেখানে ট্রেনগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। এর ফলে তারা পূর্ব লন্ডনের টেম্পল মিলস আন্তর্জাতিক ডিপোর ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এড়াতে পারবে, যেখানে ইউরোস্টার এবং ভার্জিন তাদের ট্রেনগুলো রাখবে।

রেল বিশেষজ্ঞ মার্ক স্মিথ পলিটিকোকে বলেন, ‘উভয় প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিরই আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে। তবে ট্রেন চালানোর আগে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অনেকগুলো ধাপ পার হতে হবে। ২০২৯ সালের শুরুর তারিখ নিয়ে ট্রেনিতালিয়া বর্তমানে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, কারণ তারা এমন ট্রেনের অর্ডার দিয়েছে যা ফ্রান্সে ইতিমধ্যেই অনুমোদিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইতালি বা স্পেনে প্রতিযোগিতার ফলে যেভাবে সেবার মান বেড়েছে, আসন সংখ্যা বেড়েছে এবং টিকিটের গড় দাম কমেছে—লন্ডন রুটেও তার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার কোনো কারণ নেই। এতে সাধারণ যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্বল্প দূরত্বের বিমান চলাচল খাত।’

তবে এই আশাবাদের মাঝেও সতর্ক থাকার বেশ কিছু কারণ রয়েছে, কারণ অতীতেও এমন অনেক মেগা পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। ২০১০ সালে জার্মানির রাষ্ট্রীয় রেলপথ ‘ডয়চে বান’ এই টানেল দিয়ে ট্রেন চালানোর ঘোষণা দিয়ে লন্ডনে একটি পরীক্ষামূলক ট্রেনও পাঠিয়েছিল। কিন্তু ব্রেক্সিটের কারণে সৃষ্ট আইনি জটিলতায় তারা শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে যায়।

কর্পোরেট জটিলতার কারণে যেকোনো কোম্পানি চাইলেই এই রুটে ট্রেন চালাতে পারে না। ওআরআর থেকে ট্রেনের ট্র্যাক ব্যবহারের অনুমতি পেলেও প্রতিটি দেশকে আলাদা আলাদা দেশের সীমান্ত এবং খোদ চ্যানেল টানেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লাইনে ট্রেন নামানোর টেকনিক্যাল ক্লিয়ারেন্স পেতে হবে।

তাছাড়া, ব্রেক্সিটের আগে থেকেই লন্ডন থেকে ইউরোপের নতুন নতুন গন্তব্যে ট্রেন চালানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল ছিল। কারণ যুক্তরাজ্য ইউরোপের পাসপোর্টমুক্ত সীমান্ত অঞ্চল বা ‘শেনজেন’ এলাকার বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর অর্থ হলো—লন্ডন থেকে যাতায়াতকারী প্রতিটি স্টেশনে অত্যন্ত ব্যয়বহুল পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশি এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষার জন্য সাধারণ প্ল্যাটফর্ম থেকে আলাদা করে ঘেরা বিশেষ প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন হয়। এসব জটিলতার কারণেই মূলত লন্ডনের বাইরে যুক্তরাজ্যের অন্য কোনো শহরে এই আন্তর্জাতিক ট্রেন সার্ভিস সরাসরি চালু করা লাভজনক হয় না।

এতসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও লন্ডন রুটটি এতটাই লাভজনক যে বড় বড় কোম্পানিগুলো এখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ‘জেমিনি ট্রেনস’  নামের আরেকটি কোম্পানি গ্লোবাল মোবিলিটি জায়ান্ট ‘উবার’-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে ২০৩০ সালের মধ্যে এই টানেল দিয়ে দিনে ১১টি ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা করছে। তাদের এই পরিকল্পনা সফল হলে দৈনিক ট্রিপের সংখ্যা ৬৬-তে পৌঁছাবে।

এদিকে ইউরোস্টারও বসে নেই। তারা নিজেদের একচেটিয়া বাজার ধরে রাখতে ২ বিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে ৫০টি নতুন হাইস্পিড ট্রেনের অর্ডার দিয়েছে, যা ২০৩০-এর দশকের শুরুতে সরবরাহ করা হবে। এর ফলে তারা নিজেদের আসন সংখ্যা ৩০ শতাংশ বাড়াতে পারবে এবং ফ্রাঙ্কফুর্ট ও জেনেভার মতো নতুন নতুন গন্তব্যে সরাসরি ট্রেন চালাতে পারবে।

ইংলিশ চ্যানেলের যুক্তরাজ্য অংশে প্রতি ঘণ্টায় ৮টি আন্তর্জাতিক ট্রেন চালানোর পর্যাপ্ত জায়গা থাকলেও, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের রেল ট্র্যাকে নতুন ট্রেনের জন্য জায়গা পাওয়া একটি বড় পরীক্ষা হবে। এছাড়া আরেকটি বড় সমস্যা হলো লন্ডনের সেন্ট প্যানক্রাস স্টেশনের ধারণক্ষমতা। ইতিমধ্যেই সেখানে পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণের পর যাত্রীদের বসার মতো পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। স্টেশনের ধারণক্ষমতা ২০২৮ সালের মধ্যে দ্বিগুণ করার জন্য ‘হকিন্স\ব্রাউন’ নামের স্থপতি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইউরোস্টারের প্রধান নির্বাহী গুয়েনডোলিন কাজেনাভ বলেন, ‘বেসরকারি খাতের এই বিশাল বিনিয়োগকে সফল করতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে একটি সাহসী দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রয়োজন। আমাদের আরও বেশি ট্রেনের ডিপো, সেন্ট প্যানক্রাস স্টেশনের সাহসী সম্প্রসারণ এবং একটি ঝামেলামুক্ত সহজ সীমান্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version